বিকাশমান শিল্প ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে ঋণের সুদের হার বর্তমানের ১৩-১৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে দ্রুত এক অঙ্কে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বুধবার রাজধানীর আইসিসিবি-তে আয়োজিত চার দিনব্যাপী ‘বিটিকেজি এক্সপো ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি স্পষ্ট জানান, উচ্চ সুদের হারের এই বোঝা নিয়ে টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের মতো শিল্পগুলো টিকে থাকা কার্যত অসম্ভব।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্প দেশের অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হলেও বর্তমানে জ্বালানি সংকট এবং উচ্চ সুদের হার এই খাতের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর মতে, এ ধরনের চড়া সুদের হার হয়তো উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর বা পুঁজিঘন শিল্পের জন্য সহনীয় হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের শ্রমনির্ভর ও স্বল্প মুনাফার শিল্পের জন্য এটি এক বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকি।
জ্বালানি পরিস্থিতির ওপর গুরুত্বারোপ করে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, দেশে বর্তমানে দৈনিক ৪,৩০০ এমএমসিএফডি গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদিত ও আমদানিকৃত এলএনজি মিলে বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। গ্যাসের এই দৈনিক ১,৪০০ থেকে ১,৭০০ এমএমসিএফডির ঘাটতি পূরণ করতে সরকার এলএনজি আমদানি বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে, যদিও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানের দুটি ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের জন্য আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করতে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মহাপরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করতে বাণিজ্যমন্ত্রী লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সরলীকরণের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, বর্তমানে একটি ব্যবসা শুরু করতে উদ্যোক্তাদের প্রায় ২৫-২৬টি লাইসেন্স নিতে হয়, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। সরকার এখন এমন একটি ব্যবস্থা চালুর কাজ করছে, যেখানে আবেদনের সঙ্গে সঙ্গেই ‘প্রভিশনাল অনুমোদন’ দেওয়া হবে যাতে উদ্যোক্তারা দ্রুত কার্যক্রম শুরু করতে পারেন।
বন্ড ও কর-সংক্রান্ত প্রক্রিয়াগুলোকেও ব্যবসাবান্ধব করতে এবং কর্মকর্তাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে হয়রানি বন্ধ করতে ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, করের হার বাড়ানোর চেয়ে বরং করের আওতা বাড়ানোকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, যাতে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রদর্শনীর আহ্বায়ক ফজলে শামীম এহসান এবং ইনফোচেইনের নির্বাহী পরিচালক স্পেনসার লিনও বক্তব্য প্রদান করেন। তারা আশা প্রকাশ করেন যে, এ ধরনের আয়োজন শিল্পের আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) ও ইনফোরচেইন ডিজিটাল টেকনোলজি যৌথভাবে এই মেলার আয়োজন করেছে।
এবারের এক্সপোতে বাংলাদেশসহ প্রায় ২৮টি দেশের ৯০০টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে, যা ২ মে পর্যন্ত চলবে। প্রায় ২০ হাজার বর্গমিটার এলাকায় ১,২০০টি বুথে চীন, জাপান, ভারত, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের সর্বাধুনিক টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস যন্ত্রপাতি প্রদর্শিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই প্রযুক্তিগত প্রদর্শনী শিল্পের আধুনিকায়নে বড় প্রভাব ফেলবে।













