উন্নয়ন কাজে চরম স্থবিরতা: এডিপি বাস্তবায়নে রেকর্ড সর্বনিম্ন

Web Photo Card June 25 2026 Implementation2026
প্রতীকী ছবি (AI দ্বারা তৈরি)

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল, তা এখনো অব্যাহত রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন নীতিতে কাটছাঁট করে অনেক প্রকল্প খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থমকে যায়। রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া অনেক প্রকল্পে অর্থছাড় বন্ধ রাখার সেই নেতিবাচক প্রভাব বর্তমান সরকারের আমলেও কাটেনি, বরং আরও তলানিতে নেমেছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সবশেষ প্রকাশ করা তথ্য অনুযায়ী, উন্নয়ন কার্যক্রমের এই চরম শ্লথগতির কারণে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) এডিপি বাস্তবায়ন হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৮ দশমিক ২৩ শতাংশ। অর্থবছর শেষ হতে আর মাত্র ১ মাস বাকি থাকলেও বরাদ্দের অর্ধেক অর্থও খরচ করা সম্ভব হয়নি। আইএমইডির পুরোনো তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, জুলাই-মে মেয়াদের এই সামগ্রিক অগ্রগতি গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

উন্নয়ন প্রকল্পের এই বেহাল দশা টাকার অঙ্কেও স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকার মধ্যে এই ১১ মাসে সবগুলো মন্ত্রণালয় ও বিভাগ উন্নয়ন কার্যক্রমে মাত্র ১ লাখ ৭৬৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ব্যয় করতে পেরেছে। টাকার অঙ্ক ও বাস্তবায়ন হার—উভয় দিক বিবেচনা করলেই এটি গত ছয় অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অথচ আগের অর্থবছরগুলোর একই সময়ে গড়ে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি অর্থ ব্যয় হতো।

বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এডিপি বাস্তবায়ন হার ছিল ৪৯ দশমিক ০৮ শতাংশ, যার চূড়ান্ত বার্ষিক হার শেষ পর্যন্ত রেকর্ড সর্বনিম্ন ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছিল। এ ছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬১ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়িত হয়েছিল। অর্থাৎ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের শেষ সাধারণ অর্থবছরের তুলনায়ও চলতি অর্থবছরের অগ্রগতি ৯ শতাংশের বেশি পিছিয়ে আছে।

আইএমইডির দীর্ঘমেয়াদী ওয়েবসাইট ডাটা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৪-০৫ অর্থবছর থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত কোনো অর্থবছরেই চূড়ান্ত এডিপি বাস্তবায়নের হার ৮০ শতাংশের নিচে নামেনি। এমনকি বৈশ্বিক করোনাকালের চরম সংকটের মাঝেও ২০১৯-২০ অর্থবছরে চূড়ান্ত বাস্তবায়নের হার ছিল ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যা এবারকার চলতি মেয়াদের প্রাক্কলিত হারের চেয়ে ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেশি। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে সর্বোচ্চ ৯৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়নের রেকর্ড হয়েছিল।

বর্তমান সংকটজনক পরিস্থিতিতে অর্থবছর শেষ করতে হলে বাকি মাত্র ১ মাসে সরকারকে ৫১ দশমিক ৭৭ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন করতে হবে। যার অর্থ হলো, অবশিষ্ট এই ৩০ দিনে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে খরচ করতে হবে ১ লাখ ৮ হাজার ১৭১ কোটি টাকারও বেশি। যেখানে পুরো ১১ মাসে সব মন্ত্রণালয় মিলে মাত্র ১ লাখ কোটির কিছু বেশি টাকা খরচ করতে পেরেছে, সেখানে ১ মাসে তার চেয়ে বেশি অর্থ খরচ করা শুধু অসম্ভবই নয়, বরং সম্পূর্ণ অবাস্তব। ফলে সর্বনিম্ন এডিপি বাস্তবায়নের সব রেকর্ড এবার ভেঙে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মাসিক খরচের গতিধারা বিশ্লেষণ করলেও দেখা যায়, অর্থবছরের ১১তম মাস মে-তেও আগের বছরগুলোর চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে দেশ। চলতি অর্থবছরের মে মাসে উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ হয়েছে ১৪ হাজার ২৪৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের মাত্র ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে মে মাসে খরচ হয়েছিল ১৭ হাজার ৫৮০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, যা ছিল বরাদ্দের ৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ। অর্থাৎ মাসিক হিসাবেও মে মাসে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় কমেছে প্রায় ১ শতাংশ।

এডিপি বাস্তবায়নে খাতভিত্তিক চিত্রেও নজিরবিহীন বৈষম্য ও স্থবিরতা লক্ষ করা গেছে। লক্ষ্যমাত্রা পার করতে না পেরে বরাদ্দের এক-তৃতীয়াংশও বাস্তবায়ন করতে পারেনি ৮টি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এ ছাড়া বরাদ্দের ৪০ শতাংশের গণ্ডিও পার হতে পারেনি দেশের ১৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এমনকি লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের মতো সংসদ বিষয়ক সচিবালয় বরাদ্দের কোনো অর্থই মে মাস পর্যন্ত খরচ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা খাতের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, ১১ মাসে বিভাগটির বাস্তবায়ন হার বরাদ্দের মাত্র ১২ দশমিক ২৩ শতাংশ। এ ছাড়া জননিরাপত্তা বিভাগের বাস্তবায়ন হার ১৫ দশমিক৭১ শতাংশ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ১৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ২০ দশমিক ৪৫ শতাংশ, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ২৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের বাস্তবায়ন হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

বিপরীত চিত্রে কিছু মন্ত্রণালয় বরাদ্দের বড় অংশ খরচ করতে পেরেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ ৮৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ৮২ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ৭৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে। সবচেয়ে বেশি নগদ অর্থ খরচ করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ; তারা তাদের বরাদ্দকৃত ৩৭ হাজার ৭০৯ কোটি ১০ লাখ টাকার মধ্যে ২৫ হাজার ৫৬৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় করেছে, যা মোট বরাদ্দের ৬৭ দশমিক ৮১ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রতিবছরই অর্থবছরের শেষ সময়ে এসে তড়িঘড়ি করে কাজের গতি বাড়ানোর যে তোড়জোড় শুরু হয়, তা কাজের মান যেমন খারাপ করে, তেমনি প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ বাড়িয়ে দেয়। বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, শুধু বাজেট বরাদ্দ দিলেই প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়; এর জন্য দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কার্যকর জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনা, দক্ষতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার সঠিক সমন্বয় না হলে এডিপি প্রতিবারই বার্ষিক টার্গেটের নিচে থেকে যাবে। চলতি অর্থবছরে রাজনৈতিক ডামাডোলে যে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার মূল এডিপি জানুয়ারিতে কাটছাঁট করে ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকায় নামানো হয়েছিল, তারও অর্ধেক ব্যবহার না হওয়া অলস আমলাতন্ত্রের চরম ব্যর্থতা। আকার বাড়ানোর চেয়ে প্রকল্পে দুর্নীতি, অতিরিক্ত ব্যয় ও অপচয় কমিয়ে বিদ্যমান অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন বেশি জরুরি।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top