বাজেটে জ্বালানি নিরাপত্তায় শুভঙ্করের ফাঁকি: সানেম

Web Photo Card June 25 2026 SANEM
ডিএসজে

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে কৌশলগত অগ্রাধিকার ঘোষণা করা হলেও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এই খাতের সামগ্রিক বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। নতুন বাজেটে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট বাজেটের মাত্র ১.৮৫ শতাংশ বা ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ছিল ২.১৫ শতাংশ।

বরাদ্ধ হ্রাসের এই ধাক্কার মাঝেই খাতের পুঞ্জীভূত আর্থিক দায়দেনা মেটাতে সরকার আগামী অর্থবছরেও পিডিবি ও গ্যাস খাতে বিশাল অঙ্কের আর্থিক প্রণোদনা ও ভর্তুকি বজায় রাখছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) জাতীয় সংসদে পেশকৃত এই বাজেট বিশ্লেষণ করে এই চিত্র তুলে ধরেছে।

সানেমের বাজেট বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সামগ্রিক উন্নয়ন ও রাজস্ব বরাদ্দের এই বৈষম্যের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ দুটি বিভাগের মধ্যকার বরাদ্দের ব্যবধানও আকাশচুম্বী। মোট বরাদ্দের মধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ একাই পেয়েছে ১৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ পেয়েছে মাত্র ২ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা।

যদিও আগের বছরের তুলনায় জ্বালানি বিভাগের বরাদ্দ প্রায় ৭১.৯৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, তবুও দুই বিভাগের মধ্যকার বরাদ্দের ব্যবধান এখনো ৮৪.৩৪ শতাংশের বিশাল অঙ্কে রয়ে গেছে। চলমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার এই সময়ে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই বড় ব্যবধান পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনা জরুরি বলে মনে করে সংস্থাটি।

চলতি বাজেটে পরিবেশবান্ধব রূপান্তরকে বেগবান করতে প্রথমবারের মতো সৌরশক্তি এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) ওপর অভূতপূর্ব শুল্ক ও কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সৌর খাতের বিনিয়োগ আকর্ষণে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর শূন্য শতাংশ কর হার নির্ধারণ এবং গ্রাহকদের সোলার বিলের ওপর ৫% কর রেয়াতের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এছড়াও ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সোলার যন্ত্রাংশ আমদানিতে সব শুল্ক ও কর মওকুফ করা হয়েছে। তবে দেশীয় উৎপাদন শিল্পকে উৎসাহিত করতে মাউন্টিং স্ট্রাকচার, লিথিয়াম সেল, ব্যাটারি প্যাক এবং ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমের মতো যন্ত্রাংশের শুল্ক সুবিধা ২০২৮ সালের জুনের পর প্রত্যাহার করা হবে।

একইভাবে আমদানিকৃত বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) ওপর করের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। ২৫ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের ইভির কর ৯৩% থেকে কমিয়ে ৬৪% এবং প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির কর ইঞ্জিনের আকারভেদে কমিয়ে ৭৩-৯৬% করা হয়েছে। ইভি চার্জিং স্টেশনের যন্ত্রাংশের ওপর থেকে সব ধরনের কর তুলে নেওয়া হয়েছে।

গাড়ির ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে আগাম আয়কর ২ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে যথাক্রমে ২০০ কিলোওয়াট, ৩০০ কিলোওয়াট, ৪০০ কিলোওয়াট এবং ৪০০ কিলোওয়াটের উপরের ক্ষমতার গাড়ির জন্য ২৫ হাজার, ৫০ হাজার, ৭৫ হাজার এবং ১০০ টাকা করা হয়েছে। এর বিপরীতে প্রচলিত ইন্টারনাল কম্বাশন ইঞ্জিন (আইসিই) গাড়ির কর ১৩২% থেকে বাড়িয়ে ১৫৬% করার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব পরিবহনের স্পষ্ট নীতিগত বার্তা দেওয়া হয়েছে।

সানেম এই ইতিবাচক পদক্ষেপগুলোকে স্বাগত জানালেও বাজেটের বেশ কিছু বৈপরীত্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি জানায়, বিদ্যুৎ বিভাগের মোট উন্নয়ন বাজেটের মাত্র ০.১% টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) জন্য রাখা হয়েছে এবং সামগ্রিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের ব্যয় বরাদ্দ বিদ্যুৎ বিভাগের মোট উন্নয়ন ব্যয়ের মাত্র ২.৫৩%।

তদুপরি, এনবিআরের সাম্প্রতিক আদেশ অনুযায়ী শুল্ক সুবিধাগুলো কেবল ভ্যাট-কমপ্লায়েন্ট নিজস্ব-ব্যবহারকারী এবং রেসকো মডেলের প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। এর ফলে অনেক আমদানিকারক, পরিবেশক, ইঞ্জিনিয়ারিং (ইপিসি) প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ আবাসিক ও বাণিজ্যিক ব্যবহারকারীরা এই সুবিধার বাইরে রয়ে গেছেন।

সানেম জানিয়েছে, বায়ুবিদ্যুতের জন্য কোনো আর্থিক প্রণোদনার প্রস্তাব করা হয়নি এবং ডিজেলে চলা সাশ্রয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সৌর সেচ ও সোলার স্ট্রিট লাইটিংয়ের জন্য বাজেটে সরাসরি কোনো সহায়তার উল্লেখ নেই। ২০২৮ সালের জুনের পরেই ব্যাটারি উৎপাদনের কাঁচামালের ওপর থেকে দ্রুত শুল্ক সুবিধা তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা প্রতিযোগিতাপূর্ণ দেশীয় ব্যাটারি শিল্প গড়ে তোলার বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য দেখা গেছে কয়লা ও তেল খাতে দীর্ঘমেয়াদী উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে। বাজেটে কয়লা খাতে ৬ লাখ মেট্রিক টন উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, বড়পুকুরিয়া ও দিঘিপাড়ায় ৭৪টি নতুন প্রকল্প চালু এবং কয়লা আমদানির শুল্ক সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

অন্যদিকে, দ্বিতীয় ইস্টার্ন রিফাইনারি নির্মাণের মাধ্যমে তেল শোধন ক্ষমতা বার্ষিক ৩০ লাখ মেট্রিক টন বৃদ্ধির জন্য বড় বিনিয়োগ করা হচ্ছে। সানেমের মতে, এই পদক্ষেপগুলো দেশকে দীর্ঘমেয়াদে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল করে ফেলবে এবং সরকারের পরিবেশবান্ধব রূপান্তরের নীতিকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা ও সরবরাহের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকারের স্ট্র্যাটেজিক ফুয়েল রিজার্ভ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা এবং এলএনজি আমদানিতে খরচ বাঁচানোর উদ্যোগগুলো প্রশংসনীয় হলেও এটি বাস্তবায়নে সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যেন এই উদ্যোগগুলো কেবল সাময়িক বা আপৎকালীন বিকল্প হিসেবেই ব্যবহৃত হয়, এবং কোনোভাবেই যেন দীর্ঘমেয়াদে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ার নতুন পথ তৈরি না করে।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও সংকট-সহনশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরকে বেগবান করতে সানেম সরকারের কাছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ পেশ করেছে। প্রথমত, জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের কম বরাদ্দ দেওয়ার ঐতিহাসিক প্রবণতাটি দ্রুত কিন্তু সুপরিকল্পিতভাবে পরিবর্তন করা প্রয়োজন।

স্থলভাগ ও সমুদ্রবক্ষে গ্যাস অনুসন্ধানের পরিকল্পনাগুলো অতীতে বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ার ধারা থেকে বেরিয়ে এসে এবার কার্যকরভাবে সম্পন্ন করতে হবে; যাতে জীবাশ্ম জ্বালানি পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব না হওয়া পর্যন্ত, অন্ততপক্ষে দেশীয় তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন প্রাকৃতিক গ্যাসকে একটি অন্তর্বর্তীকালীন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।

দ্বিতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের আশাব্যঞ্জক লক্ষ্যমাত্রাকে বাস্তবায়নের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) আরও বেশি বরাদ্দ রাখা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প অনুমোদনের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দিতে হবে, যেন বাজেটের বরাদ্দ সরকারি প্রতিশ্রুতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

সানেম তাদের সুপারিশে জানিয়েছে, বর্তমানে জীবাশ্ম জ্বালানিতে দেওয়া ভর্তুকির একটি অংশ সুনির্দিষ্টভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে স্থানান্তর করা উচিত। এর পাশাপাশি স্রেডাকে একটি কার্যকর এবং একমুখী সেবা কেন্দ্র গ্রিন এনার্জি হাব বা সেবা কেন্দ্রে রূপান্তর করতে এর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং বাজেট বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করার জোর সুপারিশ করা হচ্ছে।

শুধু ভ্যাট-কমপ্লায়েন্ট নিজস্ব-ব্যবহারকারী ও রেসকো মডেলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে, শূন্য শতাংশ ট্যাক্স ও শুল্ক সুবিধা দেশের পুরো সোলার ভ্যালু চেইনের জন্য উন্মুক্ত করা উচিত বলে জানিয়েছে গবেষনা সংস্থাটি। এর পাশাপাশি, দেশের প্রায় ১৭ লাখ ডিজেল চালিত পাম্পের জায়গায় সৌর সেচ পাম্প স্থাপন এবং সোলার স্ট্রিট লাইটিংয়ের জন্য সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দেশীয় ব্যাটারি উৎপাদনকারী কাঁচামালের ওপর শুল্ক ছাড়ের মেয়াদ ২০২৮ সালের পর আরও বাড়িয়ে অন্তত ১০ বছর করা উচিত, যাতে স্থানীয় উদ্যোক্তারা কারখানা স্থাপন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক সক্ষমতা অর্জনের জন্য একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদী নীতিগত সহায়তা পান।

বর্তমান বাজেটে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বায়ুবিদ্যুতের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ রাখা হয়নি। তাই বায়ুভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতের বৈচিত্র্যকরণ ও শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে এর জন্য বিশেষ আর্থিক, নীতিগত ও কৌশলগত পরিকল্পনাগত সহায়তা চালুর প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্বরোপ করেছে সানেম।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top