দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের হার এবং নজিরবিহীন মূলধন ঘাটতির চাপে টালমাটাল বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত সংস্কারে ৪৫ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এই অর্থায়নের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হবে সাধারণ আমানতকারীদের সুরক্ষা জোরদারে ‘ডিপোজিট প্রোটেকশন সিস্টেম’ শক্তিশালী করা এবং আমানত সুরক্ষা তহবিলের মূলধন বাড়ানোর কাজে।
এছাড়া সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর জন্য কার্যকর পুনর্গঠন কৌশল প্রণয়ন, জরুরি তারল্য সহায়তা কাঠামো প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘদিনের সমস্যায় জর্জরিত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কাঠামোগত সংস্কারেও তহবিলটি ব্যবহার হবে। পাশাপাশি তহবিলের একটি বড় অংশ বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত কাঠামো আধুনিকায়নের কাজে ব্যয় করা হবে।
আজ বুধবার বিশ্বব্যাংকের পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সংস্থাটির বোর্ড সভায় এই ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক পর্ষদ কর্তৃক অনুমোদিত ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ শীর্ষক এই প্রকল্পটি দেশের আর্থিক খাতের জন্য অত্যন্ত সময়োপযোগী। বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাত মূলত দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স বা সুশাসন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা এবং অনিয়মতান্ত্রিক ঋণ বিতরণের কারণে তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের আর্থিক খাতের মোট সম্পদের প্রায় ৯০ শতাংশই ব্যাংকিং খাতের দখলে থাকায় এই খাতের মাউন্টিং স্ট্রেস বা ক্রমবর্ধমান চাপ সামগ্রিক অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। চলতি ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৩২.৬ শতাংশে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য ব্যাংকগুলোর গড় খেলাপি ঋণের (৭.৯ শতাংশ) চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি।
এছাড়া, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক ঝুঁকি-ভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধনের অনুপাত ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশে নেমে গেছে। এই নজিরবিহীন মূলধন ঘাটতি ও খেলাপি ঋণের ধকল সামাল দিতেই বিশ্বব্যাংকের এই নতুন তহবিল সরাসরি ব্যবহার করা হবে।
এই প্রকল্পের অধীনে একটি বড় প্রযুক্তিগত রূপান্তর ঘটবে বাংলাদেশ ব্যাংকে, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) অবকাঠামোকে পুরোপুরি আধুনিকায়ন করা হবে। এটি আর্থিক খাতের ক্রমবর্ধমান সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবেলা করতে এবং উপাত্ত ও বিশ্লেষণমূলক ঘাটতি পূরণ করে সার্বিক আর্থিক খাতের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখবে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জঁ পেস্মে বলেন, বাংলাদেশের ১ ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর স্বপ্ন পূরণের জন্য একটি স্থিতিশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক খাত অপরিহার্য। এই প্রকল্প ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জমানো টাকা সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজনীয় সুরক্ষাকবচ তৈরি করবে এবং ব্যাংকিং খাতের ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনবে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সহ অন্যান্য শীর্ষ উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে একটি সমন্বিত ও সুসংগঠিত পদ্ধতির অংশ হিসেবে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর স্পেশালিস্ট তোশিয়াকি ওনো বলেন, এই প্রকল্প কর্তৃপক্ষের সংকট প্রস্তুতি এবং ব্যাংকিং খাতের চাপ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সরাসরি কাজ করবে।













