পুঁজিবাজার ও ব্যাংকিং সংস্কার ছাড়া বিনিয়োগ বাড়বে না

DSJ Web Photo June 25 2026 BankingSectorReform
ছবি- বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে ফেরাতে হলে শুধু বাজেট ঘোষণা বা উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, পুঁজিবাজারে আস্থা পুনরুদ্ধার, রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিনের দুর্বল সুশাসন, আর্থিক খাতের অস্থিরতা এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা দূর না হলে বেসরকারি খাতের উৎপাদনশীল বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়বে না।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি আয়োজিত ‘ডিবেটিং বাজেট অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শীর্ষক সেমিনারে দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও নীতিনির্ধারকেরা এসব মতামত তুলে ধরেন। বৃহস্পতিবার রাজধানীর ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ তাঁর প্রবন্ধে সরাসরি ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারের দুর্বলতাকে বিনিয়োগ সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কেবল কর ছাড় বা ভর্তুকি দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন নীতির স্থিতিশীলতা, সুশাসন এবং অর্থায়নের সহজলভ্যতাকে।

তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং পুঁজিবাজারকে কার্যকর ও গতিশীল করা না গেলে বেসরকারি খাতের উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়বে না। বর্তমানে অনেক উদ্যোক্তা দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সংকটে ভুগছেন। ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের চাপে দুর্বল হয়ে পড়েছে, আর পুঁজিবাজারও দীর্ঘদিন ধরে আস্থাহীনতায় ভুগছে। ফলে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন গঠন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ড. আবু ইউসুফ আরও বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া বাজেটের কোনো ঘোষণাই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রমাণভিত্তিক গবেষণা এবং কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে ডিরেগুলেশন বা নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন তদারকিতে ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয় এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়।

তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

র‍্যাপিডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক তাঁর উপস্থাপনায় বলেন, আগামী অর্থবছরে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদার শক্তিশালী পুনরুদ্ধার প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থা। তিনি বলেন, এক বছরে ৪৭ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সুদ পরিশোধের বোঝা নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য আর্থিক সক্ষমতা সংকুচিত করছে।

তিনি আরও সতর্ক করেন যে, বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁর মতে, ৮.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যের পেছনে না ছুটে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য। কারণ স্থিতিশীল অর্থনীতি ছাড়া টেকসই বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি সম্ভব নয়।

সেমিনারে অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, অর্থনীতির মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান ছাড়া শুধু বরাদ্দ বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান সংকট বাজেটের আকার নয়, বরং অর্থনৈতিক কাঠামোর চরিত্র। তাঁর ভাষায়, যতদিন পর্যন্ত দেশের অর্থনীতি লুটতরাজ ও রেন্ট-সিকিং নির্ভর কাঠামো থেকে উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে রূপান্তরিত না হবে, ততদিন কোনো বাজেট বা नीति প্রত্যাশিত ফল দেবে না।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে লুটপাট, দুর্নীতি ও বিশেষ সুবিধাভোগী গোষ্ঠীকেন্দ্রিক সম্পদ বণ্টন। এর ফলে সম্পদ সৃষ্টি না হয়ে অল্প কয়েকজনের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং বৈষম্য বেড়েছে। অন্যদিকে উৎপাদনশীল অর্থনীতি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, বিনিয়োগ বাড়ায়, উৎপাদন বৃদ্ধি করে এবং জনগণের জীবনমান উন্নত করে। কৃষি, শিল্প, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নকে গুরুত্ব না দিলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে আয় বৈষম্য আরও বেড়েছে। তিনি বলেন, শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনই যথেষ্ট নয়, বরং সেই প্রবৃদ্ধি কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর মতে, কৃষি খাতের আধুনিকায়ন এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে গ্রামীণ কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আনা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য খাত নিয়ে উপস্থাপনায় বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক ড. অতনু রব্বানী বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণ করে জিডিপির ১.০২ শতাংশে উন্নীত করা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, সেই অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা ও সুশাসন নিশ্চিত করাও জরুরি। তিনি জাতীয় স্বাস্থ্য বিমা, ইউনিভার্সাল হেলথ কার্ড এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

শিক্ষা ও শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি না হলে অর্থনীতির টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়। কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিদেশি ভাষা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যুবসমাজকে শ্রমবাজার উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।

অন্যদিকে শিল্পায়ন কৌশল নিয়ে আলোচনায় বিআইডিএসের জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক ড. কাজী ইকবাল বলেন, কর ছাড় ও ভর্তুকিভিত্তিক নীতির পাশাপাশি রাষ্ট্রকে নিজেই দেশীয় শিল্পের সবচেয়ে বড় ক্রেতার ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি বাস, ভারী যানবাহন, সৌর প্যানেল এবং আইটি হার্ডওয়্যারের মতো খাতে ‘লোকাল কনটেন্ট’ নীতি চালুর প্রস্তাব দেন, যাতে সরকারি ক্রয়ের মাধ্যমে দেশীয় শিল্পের জন্য নিশ্চিত বাজার তৈরি হয়।

সেমিনারের প্যানেল আলোচনায় অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়িক নেতারাও একমত পোষণ করেন যে, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, পুঁজিবাজারে আস্থা পুনরুদ্ধার এবং রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার ছাড়া বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাদের মতে, অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে আর্থিক খাতের সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top