ছয় মাসেরও কম সময়ে একটি দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারের দাম প্রায় পাঁচ গুণ বাড়িয়ে কোটি কোটি টাকার মুনাফা হাতিয়ে নিয়েছে সংঘবদ্ধ একটি চক্র। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানি ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স পিএলসি যখন ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জ ও মুনাফা ধরে রাখার চাপের মধ্যে রয়েছে, ঠিক তখনই কোম্পানিটির শেয়ারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে একাধিক কারসাজি চক্র। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে ৩৫ টাকা থেকে শেয়ারটির দর ১৬২ টাকায় উন্নীত হওয়ার পেছনে অন্তত তিনটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের শেয়ার নিয়ে পরিচালিত এক যৌথ তদন্তে এমন তথ্য উদ্ঘাটন করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। শেয়ারটির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে দুটি পৃথক তদন্তের একটি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে, আরেকটি এখনো চলমান রয়েছে।
প্রথম তদন্তে উঠে এসেছে, অন্তত তিনটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট পরিকল্পিতভাবে সিরিজ ট্রেডিং, কাউন্টারপার্টি ম্যাচিং এবং নিজেদের মধ্যে শেয়ার হাতবদলের মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি করে শেয়ারটির দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়েছে। এর মাধ্যমে তারা ইতোমধ্যে কোটি কোটি টাকার নগদ মুনাফা তুলে নিয়েছে। পাশাপাশি এখনো শত কোটি টাকার বেশি কাগুজে মুনাফা ধরে রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তদন্তটি পরিচালিত হয় ২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত সময়কালে সংঘটিত লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে। আলোচিত সময়ে ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের শেয়ারের দাম ৩৫ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে ৮৫ টাকা ১০ পয়সা বা ১৩৯ দশমিক ৭২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। তদন্তে দেখা গেছে, এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কোম্পানির ব্যবসায়িক সাফল্য, আর্থিক ফলাফল কিংবা কোনো মূল্যসংবেদনশীল তথ্য ছিল না। বরং একাধিক বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে বাজারে কৃত্রিম লেনদেনের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল।
বিএসইসির তথ্য অনুযায়ী, কারসাজিকারীরা ওই সময়ের মধ্যেই এক কোটি টাকার বেশি রিয়ালাইজড ক্যাপিটাল গেইন বা নগদ মুনাফা অর্জন করে। পাশাপাশি তাদের হাতে আট কোটি টাকার বেশি আনরিয়ালাইজড বা কাগুজে মুনাফাও ছিল। পরবর্তীতে একই শেয়ারের দাম আরও বাড়িয়ে প্রায় ১৬২ টাকায় নেওয়া হয়। ফলে চক্রগুলো এর মাধ্যমে আরও বড় অঙ্কের অবৈধ মুনাফা করেছে বলে মনে করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। এ কারণেই পরবর্তী সময়ের লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে দ্বিতীয় দফা তদন্ত শুরু করা হয়েছে।
বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবুল কালাম ডিএসজেকে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিষয়টি ইতোমধ্যে কমিশনের এনফোর্সমেন্ট বিভাগে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের শেয়ার কারসাজি নিয়ে গত ২১ মে থেকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ আরেকটি তদন্ত পরিচালনা করছে।
তদন্তে দেখা যায়, কারসাজির সবচেয়ে বড় চক্রটির নেতৃত্বে ছিল ওমেগা ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেড এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মো. মাশরুর আলম। তদন্তকালীন সময়ে ওমেগা ডিস্ট্রিবিউশন এআইবিএল ক্যাপিটাল মার্কেট সার্ভিসেস লিমিটেডের মাধ্যমে ৫ লাখ ৪৫ হাজার ৫৯৩টি শেয়ার কিনে ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের সর্বোচ্চ ক্রেতায় পরিণত হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাশরুর আলম নিজের নামে আরও দুটি পৃথক বিও অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ওমেগা ডিস্ট্রিবিউশনের সঙ্গে সমন্বিতভাবে ট্রেডিং পরিচালনা করেন। এই চক্রটি ধাপে ধাপে বাজার থেকে শেয়ার সংগ্রহ করে মোট ১১.৭৪ শতাংশ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরবর্তীতে কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি করে তারা প্রায় ১৮ লাখ টাকা রিয়ালাইজড গেইন এবং ৮১ লাখ টাকার বেশি আনরিয়ালাইজড গেইন অর্জন করে।
দ্বিতীয় বৃহৎ সিন্ডিকেটটির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মাকসুদা রেজা, মাকসুদা আহমেদ এবং তাদের দুই ছেলে শাহ মো. জামিউর রহমান ও শাহ মো. সামিউর রহমান। এই পরিবারটি প্রিমিয়ার ব্যাংক সিকিউরিটিজ, শান্তা সিকিউরিটিজ এবং এনআরবিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজসহ মোট সাতটি ব্রোকারেজ হাউসের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে সমন্বিতভাবে শেয়ার লেনদেন পরিচালনা করে।
মাকসুদা রেজা তদন্তকালীন সময়ে ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের সর্বোচ্চ বিক্রেতা হিসেবে চিহ্নিত হন। বিএসইসির ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক এই সিন্ডিকেট সিরিয়াল ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে শেয়ারের মূল্য বাড়িয়ে ৪২ লাখ টাকার বেশি মূলধনী মুনাফা অর্জন করেছে।
তবে তদন্ত প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানগুলোর একটি হলো এই পরিবারের কাউন্টারপার্টি ট্রেডিংয়ের প্রমাণ। বিএসইসি জানিয়েছে, তারা নিজেদের একাধিক অ্যাকাউন্টের মধ্যে ৩৩টি পৃথক হাওলার মাধ্যমে ১ লাখ ১১ হাজার bátশত ৪১টি শেয়ার হাতবদল করেছে। অর্থাৎ এক অ্যাকাউন্ট থেকে বিক্রি করা শেয়ার অন্য সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট থেকে কিনে নেওয়া হয়েছে।
পুঁজিবাজারে এ ধরনের লেনদেনকে সার্কুলার ট্রেডিং বা কৃত্রিম লেনদেন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ারটির প্রতি উচ্চ চাহিদা এবং সক্রিয় লেনদেনের ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করা। তদন্তকারীদের মতে, ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের শেয়ারের ক্ষেত্রে ঠিক এই কৌশলই প্রয়োগ করা হয়েছিল।
তৃতীয় সিন্ডিকেটটির নেতৃত্বে ছিলেন মরিয়ম আক্তার মিতু। তার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মো. খোরশেদ আলম (মিঠু), মোহাম্মদ আবুল হোসেন হাসান, আফরোজা আক্তার এবং মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম।
প্রাইম ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের মাধ্যমে মরিয়ম আক্তার মিতু ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্রেতা এবং তৃতীয় সর্বোচ্চ বিক্রেতা হিসেবে চিহ্নিত হন। সিটি ব্রোকারেজ এবং ই-সিকিউরিটিজের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে এই চক্রটি নিজেদের মধ্যে ২৮টি হাওলার মাধ্যমে ১০ হাজার ২৪৬টি শেয়ার লেনদেন করে। তদন্তে এসব লেনদেনকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কাউন্টারপার্টি ট্রেডিং হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
তবে তদন্তে কোম্পানির উদ্যোক্তা, পরিচালক কিংবা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ইনসাইডার ট্রেডিং বা অবৈধ শেয়ার লেনদেনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পুরো কারসাজি পরিচালিত হয়েছে ব্রোকারেজ হাউসের কিছু অসাধু গ্রাহক ও ট্রেডারের ট্রেডিং ওয়ার্কস্টেশন (টিডব্লিউএস) ব্যবহার করে। ওমেগা ডিস্ট্রিবিউশন, মো. মাশরুর আলম, মাকসুদা রেজা এবং মরিয়ম আক্তার মিতুর নেতৃত্বাধীন চক্রের ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ধারা ১৭(ই)(II) এবং ১৭(ই)(ভি) লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
বলা হয়েছে, তারা কৃত্রিমভাবে শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধি, বিভ্রান্তিকর লেনদেন সৃষ্টি এবং বাজারে মিথ্যা চাহিদার পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।











