নতুন ঋণের ৯০ শতাংশই যাচ্ছে পূরণো ঋণ পরিশোধে

Web Photo Card June 23 2026 Banks
ডিএসজে

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ এখন এক দানবীয় ও শ্বাসরুদ্ধকর সংকট তৈরি করেছে। বিগত যেকোনো সময়ের সমস্ত রেকর্ড ভেঙ্গে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেই ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি বিদেশি ঋণ শোধ করতে হয়েছে বাংলাদেশকে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, এখন বিদেশি ঋণের ৯০ শতাংশই চলে যাচ্ছে পূরণো ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে।

আজ মঙ্গলবার (২৩ জুন) অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জুলাই-মে মেয়াদের বৈদেশিক ঋণের যে হালনাগাদ সাময়িক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তা বিশ্লেষণে এই বিপজ্জনক চিত্র পাওয়া গেছে।

বিস্ময়কর তথ্য হলো, চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণের অর্থ পাওয়া গেছে, তার প্রায় ৯০ শতাংশ বা ৮৯ দশমিক ২৮ শতাংশ অর্থই চলে গেছে পূর্বের নেওয়া ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে।

ইআরডি’র তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের এগারো মাসে (জুলাই-মে) উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বৈদেশিক ঋণের অর্থ বা অর্থছাড় পাওয়া গেছে সর্বমোট ৪৫৭ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার ডলার। এর বিপরীতে পূর্বের নেওয়া ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করা হয়েছে ৪১৩ কোটি ২৩ লাখ ডলার, অর্থাৎ নতুন ঋণের টাকা শোধ করার পর বাংলাদেশের হাতে অবশিস্ট আছে মাত্র ৪৪ কোটি ৪৮ লাখ ৫০ হাজার ডলার।

টাকার ব্যাপক অবমূল্যায়নের কারণে দেশীয় মুদ্রায় এই ঋণের বোঝা প্রথম ১১ মাসেই ৫০ হাজার কোটি টাকার মনস্তাত্ত্ব সীমা অতিক্রম করেছে, মে পর্যন্ত মোট ঋণ পরিশোধে সরকারকে রেকর্ড ৫০ হাজার ৫১৫.৮৬ কোটি টাকা গুণতে হয়েছে। বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৩৭৮ কোটি ৪৬ লাখ ১০ হাজার ডলার (টাকার অঙ্কে ৪৫ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা)।

সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে শুধু কিস্তি পরিশোধের ব্যয়ই বেড়েছে ৩৪ কোটি ৭৬ লাখ ৯০ হাজার ডলার বা ৪ হাজার ৮৩৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিগত সময়ে মেগা প্রকল্পসহ অপ্রয়োজনীয় অনেক প্রকল্পে যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়াতেই এখন এই তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে।

চলতি অর্থবছরের আলোচ্য ১১ মাসে অতীতে নেওয়া ঋণের মূল অর্থ বা আসল পরিশোধ করতেই সরকারের ব্যয় হয়েছে ২৬৮ কোটি ৪৩ লাখ ৩০ হাজার ডলার। গত অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে আসল পরিশোধের পরিমাণ ছিল ২৩৮ কোটি ৩৩ লাখ ৭০ হাজার ডলার। এর পাশাপাশি বিশ্ববাজারে সুদের হার বৃদ্ধির কারণে শুধু সুদ বাবদই ব্যয় হয়েছে ১৪৪ কোটি ৭৯ লাখ ৭০ হাজার ডলার।

এই বিশাল অঙ্কের অর্থের সিংহভাগই পরিশোধ করতে হচ্ছে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপানের মতো বড় ঋণদাতাদের। অথচ ঋণ পরিশোধের এই ব্যাপক চাপের বিপরীতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নতুন ঋণের অর্থছাড় এবং প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের পতন ও ধীরগতি লক্ষ করা গেছে।

চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে নতুন বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১০৩ কোটি ১০ লাখ ১০ হাজার ডলার কমে গেছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে অর্থছাড় বা ঋণ পাওয়া গিয়েছিল ৫৬০ কোটি ৮১ লাখ ৬০ হাজার ডলার।

অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে মোট ঋণের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে ৪২২ কোটি ৫৩ লাখ ৯০ হাজার ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছিল ৫৬০ কোটি ৮১ লাখ ৬০ হাজার ডলার, অর্থাৎ প্রতিশ্রুতি কমেছে ১২৬ কোটি ৩২ লাখ ৭০ হাজার ডলার।

সবচেয়ে বেশি ধস নেমেছে অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে; চলতি অর্থবছরে অনুদান প্রতিশ্রুতি এসেছে মাত্র ১৫ কোটি ৮৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার, যা গত অর্থবছরে ছিল ৩৮ কোটি ৯ লাখ ৮০ হাজার ডলার।

উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে গত ১১ মাসে এককভাবে সবচেয়ে বেশি ঋণ ছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক, যার পরিমাণ প্রায় ৯৬ কোটি ডলার। এরপর ক্রমান্বয়ে রাশিয়া ছাড় করেছে ৯৩ কোটি ডলার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ৭৮ কোটি ডলার, চীন ৫৩ কোটি ডলার, জাপান ৪৩ কোটি ডলার এবং ভারত ছাড় করেছে ২৫ কোটি ডলার।

সরকার মূলত বাজেটের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বাজেট সহায়তা হিসেবে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে এই ঋণ ও অনুদান নিলেও বর্তমানে তা গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন প্রতিশ্রুতি ও ছাড় আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার বিপরীতে ঋণ পরিশোধের দায় প্রতি মাসে রেকর্ড ভাঙায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর তীব্র ক্ষয়িষ্ণু চাপ তৈরি হচ্ছে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top