ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সাড়ে ১৫ বছরের আওয়ামী শাসনের অবসান ঘটেছিল রাষ্ট্র সংস্কার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং প্রশাসনিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে নতুন এক অধ্যায়ের প্রত্যাশা নিয়ে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা ছিল ঘুষ, দালালতন্ত্র ও সেবাখাতে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা। কিন্তু সেই প্রত্যাশার বিপরীতে বাস্তবতা ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সর্বশেষ জাতীয় খানা জরিপ বলছে, সরকার পরিবর্তনের পরও নাগরিক সেবায় দুর্নীতির দৌরাত্ম্য কমেনি; বরং দেশের ৮১.৬ শতাংশ পরিবার অন্তত একটি খাতে দুর্নীতির শিকার হয়েছে এবং ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া পরিবারের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জাতীয় পর্যায়ে ঘুষ লেনদেনের প্রাক্কলিত পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ১৫.৯ শতাংশ বেশি।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে প্রকাশিত ‘সেবাখাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’-এ এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে—যে সময়টিতে ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় ছিল।
জরিপের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দুর্নীতির শিকার পরিবারের হার বেড়েছে ১৫.১ শতাংশ। একই সময়ে ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া পরিবারের হার বেড়েছে ২৫.২ শতাংশ। অর্থাৎ সরকার পরিবর্তনের পরও সেবা খাতে দুর্নীতির চিত্রে কাঙ্ক্ষিত উন্নতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি; বরং বিভিন্ন সূচকে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে।
টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত তিনটি খাত হলো পাসপোর্ট সেবা, বিআরটিএ এবং বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা। এসব খাতে সেবা নিতে গিয়ে নাগরিকদের উল্লেখযোগ্য অংশকে নিয়মবহির্ভূত অর্থ প্রদান, দালালচক্রের শরণাপন্ন হওয়া কিংবা প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে প্রাক্কলিত ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন দেশের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত জাতীয় বাজেটের ১.৫৮ শতাংশ এবং মোট জিডিপির ০.২৩ শতাংশের সমান। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি এমন এক অদৃশ্য ব্যয় যা সরাসরি সাধারণ মানুষের পকেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে এবং অর্থনীতির উৎপাদনশীল সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
জরিপে দেখা গেছে, সরকারি সেবার আংশিক ডিজিটালাইজেশন দুর্নীতি কমাতে প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। বরং ম্যানুয়াল ও ডিজিটাল পদ্ধতির সমান্তরাল ব্যবস্থাপনা নতুন ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করেছে। দালালনির্ভরতা এবং প্রশাসনিক বিবেচনার সুযোগ বহাল থাকায় দুর্নীতির ক্ষেত্রও অক্ষত রয়েছে।
ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে ৯৮.১ শতাংশ জানিয়েছে, সেবা গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়ায় ঘুষ ছিল কার্যত অনিবার্য। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ৯১.২ শতাংশ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই সরাসরি ঘুষ গ্রহণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
ঘুষ দেওয়ার কারণ সম্পর্কে ৮১.৫ শতাংশ পরিবার বলেছে, ‘ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না।’ এই তথ্যকে টিআইবি দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
স্বাস্থ্য খাতে টিকিট সংগ্রহ এবং কৃষি খাতে সার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ঘুষ ও অনিয়মের হার দুই থেকে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষা খাতে নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায়ের হার প্রায় ১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
এনজিও খাতেও দুর্নীতির বিস্তার ঘটেছে। যদিও সরাসরি ঘুষের হার খুব বেশি বাড়েনি, তবে দায়িত্বে অবহেলা, অসদাচরণ ও দুর্ব্যবহারের মতো অনিয়ম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দায়িত্বে অবহেলার হার ২২.৭ শতাংশ থেকে ৩৬.৫ শতাংশে এবং অসদাচরণের হার ১৫.২ শতাংশ থেকে ২৩.২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
জরিপে উঠে এসেছে দুর্নীতির সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে নিম্নআয়ের মানুষ। একটি পরিবার বছরে গড়ে তাদের মোট আয়ের ১.৭ শতাংশ ঘুষ হিসেবে ব্যয় করে। তবে সবচেয়ে দুর্নীতিপ্রবণ পাঁচটি খাতে দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে এই হার ৫.১ শতাংশ, যা উচ্চ আয়ের পরিবারের তুলনায় অনেক বেশি।
পাসপোর্ট সেবা নিতে গিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারের মোট ব্যয় তাদের মাসিক আয়ের ৭৮ শতাংশের সমান হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ শতাংশই ঘুষ হিসেবে পরিশোধ করতে হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও অনেক পরিবারকে তাদের মাসিক আয়ের এক-তৃতীয়াংশের বেশি অর্থ ঘুষ হিসেবে ব্যয় করতে হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ নয়, এটি বৈষম্যও বাড়ায়। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, নারী, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণি তুলনামূলক বেশি দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। জরিপ অনুযায়ী, উত্তরদাতাদের ২৯.৫ শতাংশ দুদক সম্পর্কে জানলেও অভিযোগ করেছেন মাত্র ০.৩ শতাংশ। টিআইবির মতে, এটি দুদকের প্রতি জনগণের আস্থার ঘাটতির স্পষ্ট প্রতিফলন।
সংস্থাটি মনে করে, সেবাখাতে দুর্নীতি কমাতে শুধু ডিজিটালাইজেশন নয়, জবাবদিহি, কার্যকর শাস্তি এবং প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি। অন্যথায় সরকার পরিবর্তন হলেও সাধারণ মানুষের জন্য ঘুষ ও দুর্নীতির বাস্তবতা পরিবর্তিতই থেকে যাবে।












