দেশের বর্তমান শুল্ক কাঠামো ও রাজস্ব নীতি বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের পথে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে সম্পূরক ও আবগারি শুল্কের ক্ষেত্রে উচ্চহার এবং দ্বৈত নীতি এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) আয়োজিত “সম্পূরক ও আবগারি শুল্কের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশের রাজস্ব কার্যক্রম পর্যালোচনা” শীর্ষক কর্মশালায় এসব পর্যবেক্ষণ উঠে আসে। পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তারের সভাপতিত্বে কর্মশালায় সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও গবেষকরা অংশ নেন।
শুল্ক কাঠামোর বৈষম্য তুলে ধরে জাইদী সাত্তার বলেন, “বর্তমানে আবগারি শুল্ক কাঠামোতে দ্বৈত নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। আমদানিকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে এক ধরনের শুল্কহার এবং দেশীয় পণ্যের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম হার নির্ধারণ করা হয়। দেশে প্রায় ১,৪০০টি ট্যারিফ লাইন অনুসরণ করা হলেও আবগারি শুল্কের ক্ষেত্রে তা প্রায় ১,৭০০টি।”
উল্লেখ্য, সাধারণত একটি দেশের পণ্যগুলো নির্দিষ্ট কোডের মাধ্যমে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়, যাকে ট্যারিফ লাইন বলা হয়। পিআরআই বলছে, বাংলাদেশে সাধারণ শুল্কের নিয়ম অনুযায়ী যেখানে ১,৪০০টি পণ্যের ধরন বা লাইন আছে, সেখানে সম্পূরক বা আবগারি শুল্ক বসানোর সময় সেই সংখ্যা বেড়ে ১,৭০০ হয়ে গেছে। যার মানে, শুল্ক কাঠামোটি অনেক বেশি জটিল এবং একই জাতীয় পণ্যের ওপর ভিন্ন ভিন্ন হারে শুল্ক বসানো হয়েছে, যা বিভ্রান্তি তৈরি করে।
“এর প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই দেশীয় পণ্যের ওপর আবগারি শুল্কহার আমদানিকৃত পণ্যের তুলনায় অনেক কম। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতিমালার আলোকে এটি স্পষ্টতই বৈষম্যমূলক এবং এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে,” উল্লেখ করে জাইদী সাত্তার আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি নিম্নহার এবং অন্যদের জন্য একটি আদর্শ হার—এই দুই ধরনের শুল্কনীতি বেশি উপযোগী।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সদস্য সৈয়দ মুশফিকুর রহমান বলেন, “আমরা উচ্চহারের শুল্কমাত্রাকে উৎসাহিত করতে চাই না। তবে রাজস্ব আয়ের বিষয়টিকেও বিবেচনায় রাখতে হবে। বর্তমানে আমাদের অভ্যন্তরীণ সম্পূরক শুল্কহারে প্রায় ১৭ হাজার আদর্শমাত্রা রয়েছে, যা বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সহায়ক নয়। ক্ষুদ্র ও মধ্য আয়ের ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা সন্তোষজনক নয়—এর একটি বড় কারণ হলো যৌক্তিক শুল্কহার নির্ধারণের অভাব। তবে শুল্কনীতি প্রণয়নে ব্যক্তি করহার, করপোরেট করহারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এনবিআরের প্রথম সচিব মো. মশিউর রহমান বলেন, “শুল্ক নির্ধারণসংক্রান্ত মতবিনিময় সভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।” তিনি আরও যোগ করেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশে যেসব প্রতিষ্ঠান ভূমিকা রাখছে, তাদের টিকিয়ে রাখতে হবে এবং সে অনুযায়ী একটি বাণিজ্যবান্ধব শুল্কনীতি প্রণয়ন করতে হবে।
মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) করের নিম্নমুখী হার ও আধুনিকায়ন মূল প্রবন্ধে পিআরআই-এর গবেষণা পরিচালক ড. বজলুল এইচ. খন্দকার বলেন, “বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেলেও উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত অন্যান্য দেশের তুলনায় জিডিপির বিপরীতে কর রাজস্বের অনুপাত প্রতিবছর কমছে। বর্তমানে জিডিপির প্রায় ১৭ শতাংশ আসে আবগারি শুল্ক থেকে, যা আধুনিক অর্থনৈতিক কাঠামোর তুলনায় পশ্চাৎপদ।” তিনি আরও বলেন, “দেশে করপোরেট করহার ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) হার তুলনামূলকভাবে বেশি। আবার আধুনিক বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে যেখানে পরিমাণভিত্তিক আবগারি শুল্ক আরোপ করা হয়, সেখানে বাংলাদেশে তা মূলত দামের ওপর নির্ধারিত হয়।”
স্বচ্ছতা ও ভবিষ্যৎ সংস্কার অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে এম গ্রুপের প্রধান হাফিজ চৌধুরী এনবিআরের বর্তমান কাঠামো আবগারি শুল্ক নির্ধারণে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে—সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। কর্মশালার সমাপনী বক্তব্যে পিআরআই-এর নির্বাহী পরিচালক ড. খুরশিদ আলম আর্থিক ও রাজস্ব সংস্কার বিষয়ে তথ্যভিত্তিক নীতি সংলাপ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন। অনুষ্ঠানে বক্তারা একমত হন যে, ২০১২ সালের কর আইন ও ২০১৯ সালের শুল্কনীতির জটিলতা নিরসনে একটি একক ও সহজ শুল্ক ব্যবস্থা প্রবর্তন এখন সময়ের দাবি।













