মানবসম্পদে করের চাপ, ব্যাংক কার্যক্রমে ঝুঁকির ছায়া

Web Photo Card June 27 2026 HumanResource
ডিএসজে কোলাজ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আলোচনায় মানবসম্পদ উন্নয়ন এখন আর নতুন কোনো শব্দ নয়। বাজেট বক্তৃতা, উন্নয়ন পরিকল্পনা, শিল্পনীতি, শিক্ষানীতি কিংবা ব্যাংকিং সংস্কারের আলোচনায় দক্ষ জনবল তৈরির কথা প্রায় নিয়মিত উচ্চারিত হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নীতির ভাষায় মানবসম্পদ যতটা গুরুত্ব পায়, করনীতির বাস্তবতায় সেটি কি একই মর্যাদা পায়? নাকি প্রশিক্ষণকে এখনো অনেক প্রতিষ্ঠানে ব্যয় হিসেবে দেখা হয়, বিনিয়োগ হিসেবে নয়?

প্রস্তাবিত বাজেটে প্রশিক্ষণ, সভা ফি ও সম্মানীর ওপর উৎসে কর বাড়ানোর প্রস্তাব এই প্রশ্নকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। একদিকে সরকার দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলছে; অন্যদিকে প্রশিক্ষণসংশ্লিষ্ট ব্যয়ের ওপর কর-চাপ বাড়লে দেশের প্রশিক্ষণ খাত, বিশেষ করে বেসরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী প্রশিক্ষকদের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হতে পারে। অর্থনীতির ভাষায় এটি হয়তো রাজস্ব আহরণের একটি পদ্ধতি, কিন্তু মানবসম্পদ উন্নয়নের দৃষ্টিতে এর প্রভাব আরও গভীর।

প্রশিক্ষণ কোনো বিলাসী খরচ নয়। একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন, কীভাবে ঝুঁকি বুঝবেন, গ্রাহক সামলাবেন, প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন, বিধিবিধান মানবেন এবং পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াবেন, তার বড় অংশ নির্ভর করে প্রশিক্ষণের ওপর। বিশেষ করে আর্থিক খাতে এই বাস্তবতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যাংকিংয়ে ভুল সিদ্ধান্ত শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; তা ঋণঝুঁকি, জালিয়াতি, খেলাপি ঋণ, সাইবার ঝুঁকি, মানি লন্ডারিং ঝুঁকি এবং গ্রাহক আস্থার সংকটে রূপ নিতে পারে।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এমনিতেই নানা চাপে আছে। খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি, মূলধন সংকট, ডিজিটাল রূপান্তরের চাপ, সাইবার নিরাপত্তা, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলোকে এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি দক্ষ হতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কমানো মানে ব্যয় সাশ্রয় নয়; বরং ভবিষ্যৎ ঝুঁকির বীজ বপন করা। হিসাবের খাতায় প্রশিক্ষণ ব্যয় কম দেখাতে পারে, কিন্তু ভুল ঋণ অনুমোদন, দুর্বল কমপ্লায়েন্স বা সাইবার আক্রমণের খরচ অনেক বেশি হতে পারে।

প্রস্তাবিত উৎসে কর বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নগদ প্রবাহের ওপর চাপ। অনেক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান আগেভাগে বিনিয়োগ করে কোর্স ডিজাইন করে, গবেষণা করে, কেস স্টাডি তৈরি করে, প্রশিক্ষক নিয়োগ করে, উপকরণ প্রস্তুত করে এবং তারপর বিল পায়। বিল পাওয়ার সময় যদি বড় অঙ্কের কর উৎসে কেটে রাখা হয়, তবে প্রতিষ্ঠানটির হাতে তাৎক্ষণিক নগদ কমে যায়। কর পরে সমন্বয়যোগ্য হলেও নগদ সংকটের বাস্তবতা তখন থেকেই শুরু হয়। বেতন, ভাড়া, প্রশিক্ষকের সম্মানী, প্রযুক্তি খরচ ও কনটেন্ট উন্নয়নের খরচ কিন্তু ভবিষ্যতের কর সমন্বয়ের অপেক্ষা করে না।

এর ফলে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলো তিন ধরনের চাপে পড়তে পারে। প্রথমত, তারা ফি বাড়াতে বাধ্য হতে পারে। দ্বিতীয়ত, তারা প্রশিক্ষকের সম্মানী কমাতে পারে, ফলে ভালো প্রশিক্ষক ধরে রাখা কঠিন হবে। তৃতীয়ত, তারা মান কমিয়ে স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজভিত্তিক প্রশিক্ষণে ঝুঁকতে পারে। এতে বাজারে সস্তা, কাগুজে ও আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বাড়বে; কিন্তু প্রকৃত দক্ষতা উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশে এমন প্রশিক্ষণের অভাব নেই যেখানে অংশগ্রহণকারী ফোল্ডার, সার্টিফিকেট ও দুপুরের খাবার পায়, কিন্তু কাজে ফেরার পর আচরণ বা সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন আসে না।

ব্যাংক খাতের জন্য এ ঝুঁকি আরও বড়। ব্যাংকগুলো সাধারণত প্রশিক্ষণ বাজেট নিয়ে খুব উদার নয়। লাভের চাপ, ব্যয়ের নিয়ন্ত্রণ, শাখা সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি বিনিয়োগ এবং নিয়ন্ত্রক চাহিদার মধ্যে প্রশিক্ষণ বাজেট প্রায়ই কাটছাঁটের সহজ জায়গা হয়ে ওঠে। যদি প্রশিক্ষণ ব্যয়ের খরচ ও কর-সংক্রান্ত জটিলতা আরও বাড়ে, ব্যাংকগুলো হয়তো বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ছাড়া অন্য ক্ষেত্রগুলো কমিয়ে দেবে। অ্যান্টি মানি লন্ডারিং, সাইবার নিরাপত্তা, ক্রেডিট অ্যাপ্রেইজাল, ট্রেড ফাইন্যান্স, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, টেকসই অর্থায়ন, গ্রাহক সুরক্ষা ও নেতৃত্ব উন্নয়ন—এসব ক্ষেত্রকে ব্যয়ের খাত হিসেবে দেখা হলে ব্যাংক খাতের সংস্কার দুর্বল হবে।

এখানে দেশীয় প্রশিক্ষণ প্রদানকারীদের গুরুত্ব আলাদা করে দেখা দরকার। বিদেশি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান অনেক সময় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, সার্টিফিকেশন ও বিশেষায়িত জ্ঞান দিতে পারে। সাইবার নিরাপত্তা, ফিনটেক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু অর্থায়ন, বাসেল মানদণ্ড বা উন্নত ঝুঁকি মডেলিংয়ের মতো বিষয়ে বিদেশি সহায়তা অবশ্যই প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু স্থানীয় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান দেশের ব্যাংক বাস্তবতা বোঝে। তারা জানে শাখা পর্যায়ে ঋণ ফাইল কীভাবে তৈরি হয়, গ্রাহক সম্পর্ক কীভাবে চলে, স্থানীয় ব্যবসা সংস্কৃতি কী, মাঠপর্যায়ে কমপ্লায়েন্সের সীমাবদ্ধতা কোথায় এবং ব্যাংকের কর্মীরা কোন সমস্যায় পড়ে।

সুতরাং বিদেশি জ্ঞান দরকার, কিন্তু দেশীয় সক্ষমতা দুর্বল করে নয়। যদি বিদেশি সেবা প্রদানকারীদের জন্য তুলনামূলক কর সুবিধা থাকে, তবে তা শর্তযুক্ত হওয়া উচিত। যেমন, দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া, স্থানীয় প্রশিক্ষক তৈরি করা, কারিকুলাম হস্তান্তর, বাংলা বা স্থানীয় প্রেক্ষাপটে উপকরণ তৈরি, কিংবা ট্রেইন-দ্য-ট্রেইনার মডেল চালু করা। এতে বিদেশি জ্ঞান শুধু আমদানি হবে না, দেশে স্থায়ী সক্ষমতাও তৈরি হবে।

নীতিনির্ধারকদের জন্য এখানে একটি ভারসাম্যের প্রশ্ন আছে। রাজস্ব আহরণ জরুরি, কর ফাঁকি ঠেকানোও জরুরি। কিন্তু প্রশিক্ষণ খাতকে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে ফেললে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই সব প্রশিক্ষণ ব্যয়কে একইভাবে দেখা ঠিক হবে না। স্বীকৃত ও মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের জন্য উৎসে করের হার যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা যেতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংক খাত, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, এসএমই অর্থায়ন ও কমপ্লায়েন্সসংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণে আলাদা নীতিসুবিধা বিবেচনা করা যায়।

তবে ছাড় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মান নিয়ন্ত্রণও জরুরি। প্রশিক্ষণের নামে শুধু বিল তৈরি, অনুষ্ঠান আয়োজন ও সার্টিফিকেট বিতরণ যেন না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি, প্রশিক্ষকের যোগ্যতা, কোর্সের মান, মূল্যায়ন পদ্ধতি, অংশগ্রহণকারীর শেখার ফলাফল এবং কর পরিপালন—এসব বিবেচনায় একটি নির্ভরযোগ্য অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। নইলে কর সুবিধা প্রকৃত দক্ষতা উন্নয়নের বদলে আনুষ্ঠানিকতার বাজার তৈরি করবে।

ব্যাংকগুলোরও দায়িত্ব আছে। তারা যেন কর প্রস্তাবকে প্রশিক্ষণ কমানোর অজুহাত হিসেবে ব্যবহার না করে। বরং প্রশিক্ষণ বাজেটকে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ব্যাংকগুলোর প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং ব্যাংকিং অ্যাসোসিয়েশনগুলো যৌথভাবে একটি কাঠামো তৈরি করতে পারে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণকে ব্যয় নয়, ঝুঁকি হ্রাসকারী বিনিয়োগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এতে ব্যাংকগুলোও প্রণোদনা পাবে এবং প্রশিক্ষণ খাতও স্থিতিশীলতা পাবে।

বাংলাদেশ এখন যে উন্নয়ন ও সংস্কারের পর্যায়ে আছে, সেখানে দক্ষ মানুষ ছাড়া কোনো নীতিই কার্যকর হবে না। আইন করা যায়, নির্দেশনা দেওয়া যায়, সফটওয়্যার কেনা যায়, বিদেশি পরামর্শক আনা যায়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজট করবে মানুষ। সেই মানুষ যদি প্রশিক্ষিত না হয়, তবে সংস্কার কাগজেই থাকে। আর কাগজে সংস্কারের সংখ্যা আমাদের দেশে কম নয়।

তাই বাজেট চূড়ান্ত করার আগে প্রশিক্ষণ ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সংক্রান্ত কর প্রস্তাবকে শুধু রাজস্বের চোখে দেখা উচিত নয়। এটি উৎপাদনশীলতা, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জাতীয় সক্ষমতার প্রশ্ন। মানবসম্পদকে গুরুত্ব দিতে হলে প্রশিক্ষণকে শাস্তি নয়, সহায়তা দিতে হবে। ব্যাংক খাতের জন্য এ বার্তাটি আরও জরুরি। কারণ দুর্বল মানবসম্পদ নিয়ে শক্তিশালী আর্থিক খাত গড়া যায় না, আর শক্তিশালী ব্যাংক খাত ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক সংস্কারও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারে না।

লেখক- অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইন্সিটিউট অফ ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট, এবং চেয়ারম্যান, ডিনেট।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top