বিশ্ব বাজারে সার ও জ্বালানির দামের তীব্র ওঠানামা এবং সরবরাহজনিত সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে ১১০ কোটি মার্কিন ডলারের জরুরি ঋণ সহায়তা অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা টেকসই করা এবং যেকোনো সংকটকালীন পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে দুটি পৃথক প্রকল্পের আওতায় এই বড় অঙ্কের অর্থায়ন করা হচ্ছে। ২৬ জুন এ ঋণ অনুমোদনের কথা জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জাঁ পেসমে জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্য, সার এবং জ্বালানির দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে দেশের সীমিত রাজস্ব ক্ষেত্র, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। এই ধাক্কায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্ষুদ্র কৃষকেরা এবং দেশের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা করে আমন ও বোরো মৌসুমে ধানের উৎপাদন সচল রাখতে সার সরবরাহ নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থান ও জীবিকা রক্ষা এবং জরুরি সেবাগুলো অব্যাহত রাখতেই বিশ্বব্যাংক তাৎক্ষণিকভাবে এই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তার জন্য জরুরি সহায়তা প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩০ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় সারের ৮৫ শতাংশেরও বেশি আমদানি করে থাকে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অর্থায়ন নিশ্চিত করা, যাতে ধান চাষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমন ও বোরো মৌসুমের সার আমদানি ব্যাহত না হয়।
এই অর্থায়নের মাধ্যমে ৬ লাখ মেট্রিক টন অতি প্রয়োজনীয় সার আমদানি করা সম্ভব হবে, যার অর্ধেকই হবে ইউরিয়া সার। এটি ক্ষুদ্র কৃষকদের দ্বারা চাষাবাদকৃত প্রায় ১৪ লক্াখ হেক্টর জমির ধান উৎপাদনকে সরাসরি সুরক্ষিত করবে।
বিশ্বব্যাংকের লিড ইকোনমিস্ট সুলেইমান কুলিবালি দেশের কৃষি খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা মূলত আমন ও বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল। দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে এই দুটি মৌসুম থেকে। তাছাড়া দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষি খাতের সাথে জড়িত। ফলে সার সরবরাহে যেকোনো ধরণের বিঘ্ন ঘটলে তা শুধু খাদ্য নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলবে না, বরং তা দারিদ্র্য বৃদ্ধি করবে এবং কর্মসংস্থান কেড়ে নেবে।
কন্টিনজেন্ট ইমার্জেন্সি রেসপন্স প্রকল্পের আওতায় সবচেয়ে বড় অংশ অর্থাৎ ৭১ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে অবমুক্ত করা হবে। সংকটকালীন সময়ে সাধারণ মানুষের আয় স্থিতিশীল রাখতে এবং কর্মসংস্থান ধরে রাখতে এই প্রকল্পটির নকশা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য দ্রুত নগদ অর্থ স্থানান্তর এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রত্যক্ষ সহায়তা দেওয়া হবে।
সংকটের মাঝেও দেশে খাদ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পানি সরবরাহের মতো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং মৌলিক জনসেবাগুলো যাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু থাকে, তা নিশ্চিত করতে এই ফান্ড থেকে জ্বালানি ও শক্তি খাতে অর্থায়ন করা হবে।
বিশ্বব্যাংকের লিড ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট লেসলি জিন ইউ কর্ডেরো জানান, বিশ্বব্যাংকের ক্রাইসিস প্রিপেয়ার্ডনেস অ্যান্ড রেসপন্স টুলকিটের আওতায় বাংলাদেশ এই ফান্ডের তাৎক্ষণিক প্রবেশাধিকার পাবে। চলমান ও বিদ্যমান অন্যান্য প্রকল্পের অব্যবহৃত অর্থকে পুনরায় নতুন উদ্দেশ্যে সাজিয়ে এই জরুরি তহবিল গঠন করা হয়েছে। এর ফলে যেখানে সবচেয়ে বেশি অর্থের প্রয়োজন, ঠিক সেখানেই সম্পদ পরিচালনা করা সম্ভব হবে এবং যেকোনো বড় অর্থনৈতিক বা বাহ্যিক ধাক্কা থেকে দেশের মানুষ, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানকে রক্ষা করা যাবে।













