উন্মোচন

মাদুরো আটক ইরানের জন্য বার্তা, সতর্ক রাশিয়া ও চীন

ডিএসজে কোলাজ
ডিএসজে কোলাজ

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস মার্কিন বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার ঘটনা ইরানের জন্য সতর্কবার্তা। প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় সংবাদমাধ্যমকে এমনটাই বলেছেন পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, বার্তাটি মার্কিনবিরোধী সবার জন্যই।

ঘটনার পরপরই অর্থাৎ শনিবার (৩ জানুয়ারি) নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ মাদুরোর আটকাবস্থার ছবি পোস্ট করে ট্রাম্প বলেন, “অত্যন্ত সফল এই অভিযানটি তাদের সবার জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করা উচিত, যারা আমেরিকার সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলবে বা আমেরিকানদের জীবনকে বিপন্ন করবে।”

লন্ডনের ফোর্ডহ্যাম গ্লোবাল ফোরসাইট-এর প্রতিষ্ঠাতা টিনা ফোর্ডহ্যামের ভাষ্য, “আমার কাছে মনে হচ্ছে, একটি বিশাল লাভের সম্ভাবনা তৈরি হতে চলেছে। যদিও স্বৈরাচার-পরবর্তী উত্তরণের ইতিহাস দারুন বন্ধুর এবং খুব সরল নয়।”

“দক্ষিণ গোলার্ধে আমেরিকার ট্র্যাক রেকর্ডেও বেশ সামঞ্জস্যের অভাব রয়েছে” উল্লেখ করে এই ভূ-রাজনৈতিক কৌশলবিদ বলেন, “আমি মনে করি, মাদুরো-পরবর্তী এবং শ্যাভেজ-পরবর্তী ভেনেজুয়েলা নিয়ে অনেক আশাবাদ রয়েছে। তবে বাস্তবতা সম্ভবত আরও বেশি বিশৃঙ্খল হবে।”

“সোমবার বাজার খোলার পর, আমি মনে করি এটি ‘অ্যানিম্যাল স্পিরিট’ (বিনিয়োগকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত মনোভাব) জাগাবে এবং একই সঙ্গে ইরানেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করবে,” বলেন টিনা ফোর্ডহ্যাম।

“আমরা ইরানেও ধারাবাহিকভাবে এমন আন্দোলন দেখে আসছি। ওখানকার শাসনব্যবস্থা দীর্ঘকাল ধরেই জনবিচ্ছিন্ন। এবারের বিক্ষোভটি গতি পাচ্ছে। এই দুটি দেশই (ভেনেজুয়েলা ও ইরান) জ্বালানি উৎপাদনকারী এবং বিশাল ভোক্তা বাজার, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। এখন সম্ভবত তা উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে।”

মাদুরোকে আটকের পর ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র একটি বিশেষ “গ্রুপের” মাধ্যমে দেশটি পরিচালনা করবে, যার লক্ষ্য হবে তেলের উৎপাদন পুনরায় সচল করা।

ইরানে চলমান অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও বিক্ষোভের কথা উল্লেখ করেও ট্রাম্প সরাসরি হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “যদি ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে।”

আরএফই, এপি ও সিটিভি নিউজে প্রকাশ, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মনে করেন, ভেনেজুয়েলায় যা ঘটেছে, তা যেকোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য একটি অশনিসংকেত। ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভে ট্রাম্পের সমর্থনের ঘোষণাকে তারা “সন্ত্রাসবাদে উসকানি” এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তেহরানের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন যে “বেপরোয়া” নীতি গ্রহণ করেছে, তা মধ্যপ্রাচ্য এবং ল্যাটিন আমেরিকায় দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের জন্ম দেবে।

লন্ডনের সল্টমার্শ ইকোনমিকস-এর অর্থনীতিবিদ মার্শেল আলেকজান্দ্রোভিচ বলেছেন, “এই ঘটনাগুলো স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার খবর বারবার মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে এবং বাজারকে প্রভাবিত করছে।”

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে আলেকজান্দ্রোভিচ আরও বলেন, “মার্কিন শুল্ক নিয়ে অমীমাংসিত বাণিজ্য উত্তেজনা থেকে শুরু করে ইউক্রেন, ইরান, তাইওয়ান এবং এখন ভেনেজুয়েলা—এটি স্পষ্ট যে, বাজারগুলোকে আগের মার্কিন প্রশাসনগুলোর তুলনায় এখন অনেক বেশি ‘হেডলাইন রিস্ক’ বা শিরোনাম হওয়ার ঝুঁকির মোকাবিলা করতে হচ্ছে।”

অন্যদিকে, রয়টার্সকে নিউইয়র্কের আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটস-এর গ্লোবাল কমোডিটি স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড মেনা রিসার্চ প্রধান হেলিমা ক্রফট বলেছেন, “তেল খাতের কয়েক দশকের পতন বিবেচনা করলে এটি একটি বিশাল ঘটনা। তাছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন এবং রাষ্ট্র গঠনের ট্র্যাক রেকর্ড একেবারেই প্রশ্নাতীত সাফল্যের নয়।”

উইসকনসিনের ব্রুকফিল্ড থেকে অ্যানেক্স ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট-এর প্রধান অর্থনৈতিক কৌশলবিদ ব্রায়ান জ্যাকবসেন বলেছেন, “আমি নিশ্চিত যে, মানুষ এর রাজনৈতিক এবং আইনি দিক নিয়ে বিতর্ক করবে। কিন্তু বিনিয়োগের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশাল পরিমাণ তেলের মজুত উন্মুক্ত করতে পারে।”

“সংঘাতের প্রত্যাশায় বাজারগুলো মাঝে মাঝে ‘রিস্ক-অফ’ মোডে (ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা) চলে যায়। কিন্তু সংঘাত শুরু হয়ে গেলে তারা দ্রুত ‘রিস্ক-অন’ মোডে ফিরে আসে,” উল্লেখ করে ব্রায়ান জ্যাকবসেন, “যেহেতু এটি খুব দ্রুত ঘটেছে, তাই সম্ভবত শুধুমাত্র তেলের বাজারগুলোতেই প্রভাব পড়বে। তেল সরবরাহের আধিক্য নিয়ে প্রচুর পূর্বাভাস ছিল এবং এটি কেবল সেই আধিক্যই বাড়াবে।”

এই বিশ্লেষকও মনে করেন, “এই ঘটনাটি পরিবর্তন আনার ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা এবং সক্ষমতা সম্পর্কে ইরান এবং সম্ভবত রাশিয়ার নেতৃত্বের জন্যও একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।”

ল্যাটিন আমেরিকায় ভেনেজুয়েলা রাশিয়ার সবচেয়ে বড় মিত্র ছিল উল্লেখ করে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, রাশিয়া এই অভিযানকে সরাসরি “সশস্ত্র আগ্রাসন” হিসেবে অভিহিত করেছে এবং মাদুরোর মুক্তি দাবি করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, “আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সার্বভৌম একটি দেশের আইনত নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও তাঁর স্ত্রীকে মুক্তি দেওয়ার জন্য কঠোরভাবে আহ্বান জানাচ্ছি।”

রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং ভেনেজুয়েলার জনগণের প্রতি রাশিয়ার “দৃঢ় সংহতি” প্রকাশ করেন। মস্কোর মতে, ওয়াশিংটন যে মাদক পাচারের অভিযোগ তুলেছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং এই অভিযান আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে।

এখানে চীনেরও বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে আছে। তারা ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় ঋণদাতা দেশ। গত এক দশকে চীন দেশটিকে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে, যার বেশিরভাগই তেলের মাধ্যমে পরিশোধ করার কথা ছিল। যে কারণে চীনও এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং আমেরিকার “আধিপত্যবাদী আচরণ” হিসেবে বর্ণনা করেছে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “চীন একটি সার্বভৌম দেশের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োগ এবং দেশটির প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে গৃহীত এই পদক্ষেপে গভীরভাবে মর্মাহত এবং এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।” বেইজিং দাবি করেছে যে, আমেরিকার এই পদক্ষেপ ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে জাতিসংঘের সনদের মূলনীতি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।

এই ইস্যুতে চীন এবং রাশিয়া একই অবস্থানে থাকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দ্য গার্ডিয়ান, টাইমসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বলছে, তারা (রাশিয়া ও চীন) জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আমেরিকার এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস মনে করছেন, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলায় তিনি “গভীরভাবে শঙ্কিত”, যা একটি “বিপজ্জনক নজির” তৈরি করেছে। তাঁর মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক এক বিবৃতিতে বলেন, “মহাসচিব জাতিসংঘ সনদসহ আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সকলের পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল হওয়ার গুরুত্বের ওপর ক্রমাগত জোর দিয়ে আসছেন।”

“আন্তর্জাতিক আইনের নিয়মগুলো মানা না হওয়ায় তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন,” যোগ করেন এই মুখপাত্র।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top