মেগা প্রকল্প বানিয়ে মানুষকে চমকে দিয়ে উন্নয়নের ফানুস তৈরি করে মেগা লুটের ব্যাপারে এই সরকারের কোনো আগ্রহ নেই। ফ্যাসিস্ট আমলে গৃহীত যেসব মেগা প্রকল্প এখন বন্ধ করে দিলে বড় ধরনের অপচয় ও সমস্যা হতে পারে, সেগুলোকে যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে বাছাই করা হচ্ছে। সরকার মেগা প্রকল্পের ব্যাপারে এখন বেশ রক্ষণশীল।
আজ শনিবার এফডিসিতে ‘বাজেটের সুফল পেতে অর্থের জোগান ও বাস্তবায়ন দক্ষতা’ নিয়ে আয়োজিত এক ছায়া সংসদে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ এবং প্রতিযোগিতাটি আয়োজন করে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি।
ছায়া সংসদে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, মেগা প্রকল্পের চাইতে মানবসম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্রিক আইটি ও প্রয়োজনীয় প্রকল্পকে এখন বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নের হার হতাশাজনক হলেও এই অবস্থা উত্তরণে সরকার সচেষ্ট রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদের আমলে যেভাবে মেগা প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে, সেই সংস্কৃতির অবসান ঘটানোই এই সরকারের মূল লক্ষ্য। এখন থেকে যেকোনো প্রকল্পের উপযোগিতা এবং জনগণের সরাসরি কল্যাণ বিবেচনা করে তবেই বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হবে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, আগের সরকারের রেখে যাওয়া প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক অদক্ষতার কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের গতি ধীর। তবে সরকার এই প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও গতিশীল করতে নিরলসভাবে কাজ করছে, যাতে জনগণের করের টাকার সর্বোচ্চ সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
করের পরিধি বাড়ানোর প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ক্ষুদে দোকানদাররা যাতে ন্যূনতম কর দিতে পারে সেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হয়রানির উদ্দেশ্যে নয়, বরং ন্যায্যতার ভিত্তিতেই কর আদায় করা সরকারের মূল উদ্দেশ্য। করের পরিধি বাড়াতে গিয়ে দেশে কেউ হয়রানির শিকার হবে না।
সাধারণ মানুষকে মূল্যস্ফীতির অভিঘাত থেকে রক্ষার জন্য ৬০টি নিত্যপণ্যের ওপর কর কমানো হয়েছে বলে তিনি তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন।
ছায়া সংসদে সভাপতির বক্তব্যে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, আওয়ামী সরকারের ভুল নীতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি ভেঙে পড়েছিল। বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে।
সে সময় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও সুশাসনের অভাবে বাজেটের প্রত্যাশিত সুফল জনগণ পায়নি। বাজেটের সুফল পেতে অর্থের জোগান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এর বাস্তবায়ন দক্ষতাও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী সরকারের আমলে অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছে।
হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ আরও বলেন, বিগত সরকারের আমলে প্রতিটি প্রকল্পই ছিল অতিমূল্যায়িত এবং মেগা প্রকল্পের আড়ালে মেগা চুরি হয়েছে। এমনকি ছোট ছোট প্রকল্পগুলোতেও চুরি মেগা প্রকল্পের চুরিকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। রাজনৈতিক বিবেচনায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত কয়েকটি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়া হয়েছিল।
সরকার বলছে তারল্য সংকট মোকাবিলায় টাকা ছাপানোর প্রয়োজন হবে না, অথচ আমরা দেখছি টাকা ছাপিয়ে ইসলামী ব্যাংককে ৯ হাজার কোটি টাকা ধার দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ভবিষ্যতে যদি আরও টাকা ছাপিয়ে তারল্য সংকট মোকাবিলা করা হয় তাহলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে।
বৈদেশিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হলে সরকারকে শিল্প-কারখানায় গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের নীতি সহায়তার মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান মুখ থুবড়ে পড়বে।
আওয়ামী সরকারের আমলে গ্যাস দেওয়ার প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষিতে উদ্যোক্তারা কারখানা স্থাপন করলেও এখনো পর্যন্ত সংযোগ পায়নি। ৫৫৫-টির মতো ছোট, মাঝারি ও বড় শিল্প-কারখানা গ্যাস প্রাপ্তির সব প্রক্রিয়া শেষ করার পরেও গ্যাস পাচ্ছে না। এতে ২৩ হাজার কোটি টাকার অলস বিনিয়োগ পড়ে আছে, অথচ মাস ঘুরলেই ব্যাংক সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
এবারের বাজেটে চাল, ডাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেলসহ ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎস কর কমিয়ে জনগণকে স্বস্তি প্রদানের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে অন্যদিকে মুদি দোকান ও কনফেকশনারিসহ তৃণমূল পর্যায়ের ১৬টি ব্যবসায়িক খাতে ভ্যাট আরোপ এবং জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি জনগণকে অস্বস্তিতে ফেলবে।
অধিকাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ট্রেড লাইসেন্স, নিয়মিত হিসাবপত্র বা স্থায়ী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নেই। একইসাথে তাদের ডিজিটাল লেনদেনও অত্যন্ত সীমিত। এই পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের থেকে ভ্যাট আরোপের মাধ্যমে আয় করার চেয়ে সরকারের প্রশাসনিক ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
দিনশেষে ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর করের এই বোঝা সাধারণ ভোক্তাদের ওপরই পড়বে, যার ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতি আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
‘জাতীয় বাজেটের সুফল পেতে অর্থের জোগান অপেক্ষা বাস্তবায়ন দক্ষতা বেশি জরুরি’ শীর্ষক এই ছায়া সংসদ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটিকে পরাজিত করে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের বিতর্কিকরা বিজয়ী হয়।













