রাজস্বে সর্বকালের রেকর্ড ঘাটতি: দিশেহারা নতুন সরকার

ডিএসজে কোলাজ
ডিএসজে কোলাজ

চলতি অর্থবছরে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ধস নেমেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে দেখা যাচ্ছে, অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৭ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। আজ মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) এনবিআর সূত্রে এই উদ্বেগজনক তথ্য জানা গেছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ ঘাটতির রেকর্ড।

বিগত অর্থবছরের পুরো সময়ে যেখানে মোট ঘাটতি ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা, এবার মাত্র নয় মাসেই সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ায় নতুন সরকারের জন্য এটি এক কঠিন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সরকারের অভ্যন্তরীণ আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে এনবিআরকে চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রকৃতপক্ষে আদায় হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কম। যদিও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ১১.১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে, কিন্তু বিশাল লক্ষ্যমাত্রার সামনে এই প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত সামান্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আদায়ের এই নাজুক অবস্থায় আয়কর, ভ্যাট এবং কাস্টমস—তিনটি প্রধান খাতের কোনোটিই তাদের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি।

এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, রাজস্ব আদায়ে এই ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের পেছনে মূলত রাজনৈতিক পটপরিবর্তন-পরবর্তী ব্যবসায়িক স্থবিরতা, নতুন বিনিয়োগে অনীহা এবং আমদানিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ দায়ী, যা শুল্ক ও আয়কর আদায়কে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য শ্লথ হয়ে পড়েছে।

পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট, রাজস্ব প্রশাসনের কাঠামোগত সংস্কারের অভাব এবং আইএমএফের শর্ত পূরণে দেশের সক্ষমতার বাইরে অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করার ফলে শেষ পর্যন্ত এই রেকর্ড পরিমাণ ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় নেমেছে আয়কর খাতে, যেখানে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া আমদানি শুল্ক খাতে ২২ হাজার ৯৭৩ কোটি এবং ভ্যাট বা মূসক আদায়ের ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা পিছিয়ে আছে সংস্থাটি। মূলত মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিতিশীলতা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যার ফলে আমদানি ও বিনিয়োগের গতি কমে গিয়ে রাজস্বের এই নাজুক অবস্থা তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো অর্থবছরের বাকি তিন মাসে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব সংগ্রহ করা, যেখানে জুন পর্যন্ত এনবিআরকে আরও ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকা আদায় করার এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে প্রতি বছর জিডিপির আধা শতাংশের বেশি অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের বাধ্যবাধকতা রাজস্ব খাতের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। এনবিআর কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব সংগ্রহে ব্যর্থ হওয়ায় ইতিমধ্যে আইএমএফের ঋণের ষষ্ঠ কিস্তি ছাড় নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে, যা অন্যান্য বিদেশি উৎস থেকে অর্থায়নের পথকেও সংকুচিত করে তুলছে।

রাজস্ব আয়ের রেকর্ড ঘাটতির সময়ে বৈদেশিক অর্থ ছাড়ও কমে গেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছরের তুলনায় এবার বৈদেশিক ঋণের অর্থ ছাড় কমেছে প্রায় ২৬ শতাংশ, বিপরীতে আগের ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ বেড়েছে ১০ শতাংশ।

অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ব্যয় মেটাতে গিয়ে সরকারের ব্যাংক ঋণের নির্ভরতাও চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা পুরো অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রাকে ইতিমধেই ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরবর্তী ৪২ দিনে (১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত) ব্যাংক খাত থেকে ৪০ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থাৎ নতুন সরকার গঠনের পর রাষ্ট্রকে গড়ে প্রতিদিন ৯৭০ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের ঋণ নিতে হচ্ছে।

রাজস্ব খাতের এই অচলাবস্থা নিরসনে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এনবিআর বিলুপ্ত করার অধ্যাদেশসহ কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বর্তমান সরকার তা জাতীয় সংসদে বিল আকারে উত্থাপন না করায় প্রক্রিয়াটি ঝুলে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, একই সংস্থার হাতে নীতি প্রণয়ন এবং আদায়কারী ক্ষমতা থাকায় জবাবদিহিতার ঘাটতি ও স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ থেকে যাচ্ছে, যা রাজস্ব আদায়ে বড় বাধা।

দেশের উন্নয়ন ব্যয় ও মেগা প্রকল্পগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের বিকল্প নেই। তাই কেবল করের আওতা বাড়ানো নয়, বরং কর ফাঁকি রোধ, দুর্নীতি দমন এবং পুরো রাজস্ব প্রশাসনকে আধুনিকায়ন করার মাধ্যমে দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম শুরু না করলে এই বিশাল ঘাটতি বাজেটের ভারসাম্য নষ্ট করে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে চরম সংকটে ফেলতে পারে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top