“একবার যেই ব্যাংক আজান দিয়ে, তকবিরে লিল্লাহ দিয়ে দখল করা হলো, সেই ব্যাংকের দখলটা এখন বেদখল হয়ে যাচ্ছে। এই বেদখল হয়ে যাওয়ার যাতনা তো আমরা বুঝি মাননীয় স্পিকার।” জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের এমন চরম রসাত্মক ও তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক কটাক্ষকে কেন্দ্র করে আজ সংসদ কক্ষজুড়ে নজিরবিহীন তোলপাড় ও হাসির রোল পড়ে যায়। নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া তীব্র অস্থিরতার জেরে দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’ নিয়ে সংসদে আনা এক জরুরি নোটিশের ওপর আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যটিই ছিল আজকের বিতর্কের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও মুখরোচক অংশ।
কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধি অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার প্রকৃত মালিকদের কাছে ফেরত দেওয়া এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবিতে নোটিশটি উত্থাপন করেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। এই নোটিশের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জামায়াত নেতাদের রাজনৈতিক অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনীতির হাতিয়ার বানানোর প্রবণতাকে কটাক্ষ করে বলেন, “এখন বলা হচ্ছে আপনারা ব্যাংকের মালিক না। জামায়াতে ইসলাম ব্যাংকের মালিক না। আবার বলছে ইসলামের ওপর হাত দেবেন না। ইসলামী ব্যাংক কোনো ইসলাম নয়। আমাদের জনাব ফখরুল ইসলামও ইসলাম নন, জামায়াতে ইসলামও ইসলাম নয়।”
আলোচনার সূত্রপাত করে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেছিলেন যে, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ইসলামী ব্যাংকের প্রকৃত শেয়ারহোল্ডারদের জোরপূর্বক তাড়িয়ে দিয়ে শেয়ারের মালিকানা এস আলম গ্রুপের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর শেয়ারহোল্ডাররা নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলেও বর্তমানে আবারও একটি প্রভাবশালী চক্র ‘বিতর্কিত’ চেয়ারম্যান নিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকটি নতুন করে দখলের পাঁয়তারা করছে।
তিনি দাবি করেন, নতুন চেয়ারম্যান যোগ দেওয়ার পরপরই মাত্র এক সপ্তাহে ব্যাংক থেকে ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে এবং ব্যাংকটি তারল্য সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকা ধার চেয়েছে, যা দেশের আর্থিক খাতের জন্য চরম লজ্জাজনক। তিনি অবিলম্বে ব্যাংকের এমডিকে পদত্যাগের চাপ দেওয়া বন্ধ এবং শেয়ার প্রকৃত মালিকদের কাছে ফেরানোর দাবি জানান।
জামায়াত নেতাদের এই শেয়ার ডাকাতির অভিযোগের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘শেয়ারহোল্ডার ইজ শেয়ারহোল্ডার’ নীতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, তারা কীভাবে অতীতে শেয়ার খরিদ করেছে সেটি দুদক বা আইনি তদন্তের বিষয়, কিন্তু বর্তমানে বৈধ কাগজপত্রের ভিত্তিতে একটি সুনির্দিষ্ট গ্রুপের কাছে ৮১ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। অতীতে ইবনে সিনার মতো প্রতিষ্ঠানও ব্লক মার্কেটে তিন গুণ দামে শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা লুটে চলে গেছে। বৈধ এবং প্রকৃত শেয়ারহোল্ডারদের কাছে এই মালিকানা ফেরত দেওয়ার যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, তবে সরকার আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে কোনো ‘মবক্রেসি’ বা জোরপূর্বক জবরদখল কোনোভাবেই বরদাশ করবে না।
বক্তব্যের একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংকে সংঘটিত হওয়া নজিরবিহীন আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের এক দীর্ঘ খতিয়ান সংসদে তুলে ধরেন। তিনি জানান, ৫ আগস্টের পর থেকে রাজনৈতিক বৈতরণী পার হওয়ার জন্য ব্যাংকের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প আরডিএস -এর মাধ্যমে নিয়মবহির্ভূতভাবে আরও ১১ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া হেড অফিসের অনুমোদন ছাড়াই ঢাকা থেকে কক্সবাজারের বিমানের টিকিট পর্যন্ত করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি (সিএসআর) তহবিল থেকে করানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন, তকবির দিয়ে ব্যাংক দখলের পর কোনো আইনকানুন না মেনে ৯ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের ৬ হাজার নতুন লোককে নিয়োগ দিয়ে অনেককে নিয়ম ভেঙে তিনটি করে প্রমোশন দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, ৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংক থেকে বিতর্কিত ‘নাবিল গ্রুপকে’ ৭০০ কোটি টাকার এলসি ঋণ দেওয়া হয়েছে, যার মালামাল বিক্রি করলেও ব্যাংকের টাকা আর ফেরত দেওয়া হয়নি। দুষ্টু লোকেরা বলে, সেই টাকা কোনো একটি নির্দিষ্ট দলের নির্বাচনী তহবিলে গেছে। ১৬ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক দায় থাকা এই নাবিল গ্রুপ এবং লক্ষ কোটি টাকা পাচার করা এস আলম গ্রুপসহ যারাই মানুষের টাকা বিদেশে পাচার করেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে সবার বিরুদ্ধে তদন্ত হবে।
বর্তমান নতুন চেয়ারম্যানের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী উভয়েই জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনা অনুযায়ী এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অতীতে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং আইনি প্রক্রিয়া মেনেই তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিতর্কের সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দৃঢ়তার সাথে বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হওয়া এই ইসলামী ব্যাংক বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে। তিনি বিরোধী দলকে ব্যাংকের ভেতর ও বাইরে সংগঠিত বিক্ষোভের মাধ্যমে আর্থিক খাতে অস্থিরতা তৈরি না করে গঠনমূলক রাজনীতি করার আহ্বান জানান। অর্থমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ব্যাংকের আর্থিক শৃঙ্খলা ও সুশাসন পুনরুদ্ধার করা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং কোনো সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থে ইসলামী ব্যাংককে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হলে তা কঠোর হস্তে দমন করা হবে।













