দেশের ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি আকারের রাসায়নিক বাজার এখনো আমদানিনির্ভরতার বৃত্ত ভাঙতে পারেনি। ফলে তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াসহ রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা দুর্বল হচ্ছে। ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের সতর্কবার্তা, দ্রুত শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে তোলা না গেলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিই বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের শিল্পায়নের পরবর্তী ধাপ নির্ভর করছে রাসায়নিক শিল্পে দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর। কিন্তু উচ্চ শুল্ক, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সংকট, লাইসেন্স ও পরিবেশগত অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রিতা, দুর্বল লজিস্টিক অবকাঠামো এবং নীতিগত জটিলতার কারণে সম্ভাবনাময় এই খাত এখনো কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি।
শনিবার রাজধানীতে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘রাসায়নিক নির্ভর রপ্তানিমুখী শিল্পে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতের উন্নয়ন’ শীর্ষক সেমিনারে সরকারি কর্মকর্তা, শিল্প উদ্যোক্তা, গবেষক ও ব্যবসায়ী নেতারা এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশের তৈরি পোশাক, বস্ত্র, চামড়া ও ওষুধ শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অনেকাংশেই নির্ভর করে প্রতিযোগিতামূলক রাসায়নিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর। কিন্তু কাঁচামালের অতিমাত্রায় আমদানিনির্ভরতা, উচ্চ শুল্ক, পরিবেশগত ছাড়পত্রে দীর্ঘসূত্রিতা এবং লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা পুরো শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
তিনি বলেন, রপ্তানিমুখী শিল্পের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় রাসায়নিক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে একটি কার্যকর জাতীয় রোডম্যাপ প্রণয়ন এখন আর ঐচ্ছিক নয়, বরং কৌশলগত প্রয়োজন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এস আর ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ রাব্বানী। তিনি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক বাজারের আকার ৬ থেকে ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং প্রতিবছর এই বাজার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে সম্প্রসারিত হচ্ছে।
তার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৬.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রাসায়নিক পণ্য আমদানি করেছে, যার বড় অংশই ব্যবহার হয়েছে তৈরি পোশাক, ওষুধ ও চামড়া শিল্পে।
তিনি বলেন, এত বড় বাজার থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়েনি। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে এবং শিল্পের উৎপাদন ব্যয়ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীদের তুলনায় বেশি থেকে যাচ্ছে।
আসিফ রাব্বানীর মতে, লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা, উচ্চ শুল্ক, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং কার্যকর সাপ্লাই চেইনের অভাব এই শিল্পের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। তাই নীতিমালার আধুনিকায়নের পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ জরুরি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের (বিআইএম) মহাপরিচালক মো. সলিম উল্লাহ বলেন, সরকার বর্তমানে শিল্পনীতি সংস্কারের কাজ করছে। রাসায়নিক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের জন্য পৃথক নীতিমালা প্রয়োজন, নাকি বিদ্যমান শিল্পনীতিতেই নতুন অধ্যায় যুক্ত করা হবে—সে বিষয়ে উদ্যোক্তাদের সুস্পষ্ট মতামত পেলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে। তিনি দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) সদস্য আবুল ফাতাহ মো. বালিগুর রহমান বলেন, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবন ও শিল্পখাতের বাস্তব চাহিদার মধ্যে এখনো পর্যাপ্ত সমন্বয় নেই। বিসিএসআইআরের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও পণ্য শিল্পে ব্যবহারের মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব।
বিকেএমইএর পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পে যেভাবে নীতিসহায়তার মাধ্যমে শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে উঠেছে, রাসায়নিক শিল্পেও একই ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন। এতে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়বে।
বিজিএমইএর পরিচালক শেখ এইচ এম মোস্তাফিজ বলেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উৎপাদন এবং বিশেষায়িত কেমিক্যাল শিল্পাঞ্চল ছাড়া এই খাতের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএপিআই) ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি এম. মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, একটি শক্তিশালী কেমিক্যাল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
অন্যদিকে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. আক্তার হোসেন বলেন, এপিআই শিল্পপার্কের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের ধীরগতির কারণে অনেক উদ্যোক্তা বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দ্বিতীয় সচিব (শুল্ক, রপ্তানি ও বন্ড) সুরাইয়া সুলতানা জানান, স্থানীয় উৎপাদন উৎসাহিত করতে ধাপে ধাপে শুল্কহার কমানো হচ্ছে। একই সঙ্গে বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইনে নেওয়া হয়েছে।
তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. জিয়াউল হক বলেন, শিল্প সম্প্রসারণের নামে কোনোভাবেই ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা যাবে না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, রাসায়নিক শিল্পে কার্যকর ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে তোলা গেলে শুধু আমদানিনির্ভরতা কমবে না; বরং তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া, কৃষি ও হালকা প্রকৌশলসহ একাধিক রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমবে, স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের শিল্পায়নের ভিত্তিও আরও শক্তিশালী হবে।













