দেশের আবাসন বাজারে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে বিনিয়োগ ও ফ্ল্যাট বিক্রি বাড়াতে সরকারের কাছে ছয় দফা সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। সিঙ্গেল ডিজিট সুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণ চালু, নিবন্ধন ব্যয় ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, জমির মালিকদের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ মূলধনী কর প্রত্যাহার এবং নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) আবাসন কর্মসূচি চালুর দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বুধবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজালের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল এসব প্রস্তাব তুলে ধরে। বৈঠকে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন, মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া (দিপু) এমপিসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে ড. আলী আফজাল বলেন, আবাসন খাত দেশের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক খাত। বর্তমানে এই খাতের মাধ্যমে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এর অবদান প্রায় ১৫ শতাংশ। একই সঙ্গে সিমেন্ট, রড, ইট, কাচ, সিরামিক, টাইলস, রং, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, স্যানিটারি, ফার্নিচার ও পরিবহনসহ ৩০০টির বেশি লিংকেজ শিল্প আবাসন খাতের ওপর নির্ভরশীল।
তিনি বলেন, সীমিত ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এখনই জাতীয় ভূমি জোনিং নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন। ২১০০ সাল পর্যন্ত সম্ভাব্য জনসংখ্যা, নগরায়ণ ও আবাসনের চাহিদা বিবেচনায় কৃষি, শিল্প, আবাসিক, বাণিজ্যিক, বনাঞ্চল ও জলাশয়ভিত্তিক বৈজ্ঞানিক ভূমি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বর্তমান ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) ও নির্মাণ বিধিমালা যুগোপযোগী করারও প্রস্তাব দেওয়া হয়।
রিহ্যাব জানায়, নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারি জমি, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং নীতিগত সহায়তার সমন্বয়ে পিপিপি ভিত্তিক আবাসন কর্মসূচি চালু করা জরুরি। পাশাপাশি মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সহজ শর্তে সিঙ্গেল ডিজিট সুদে দীর্ঘমেয়াদি হাউজিং লোন চালুর দাবি জানানো হয়, যাতে লাখো মানুষ নিজের আবাসনের সুযোগ পায়।
বৈঠকে আবাসন খাতের কর কাঠামো নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন উদ্যোক্তারা। তাদের দাবি, বাংলাদেশে সম্পত্তি নিবন্ধন ব্যয় এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বেশি। মালয়েশিয়া, চীন, থাইল্যান্ড ও হংকংয়ের মতো নিবন্ধন ব্যয় ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হলে প্রকৃত লেনদেনমূল্যে নিবন্ধন বাড়বে, অপ্রদর্শিত অর্থের ব্যবহার কমবে এবং সরকারের রাজস্বও বাড়বে।
রিহ্যাব আরও দাবি করে, চলতি অর্থবছরে জমির মালিকদের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ মূলধনী কর প্রত্যাহার করা উচিত। তাদের মতে, এই কর শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাটের মূল্য বাড়িয়ে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
সংগঠনটি বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদন, জমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধনসহ পুরো অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল করারও আহ্বান জানায়। এতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সময়ক্ষেপণ ও হয়রানি কমে সেবা আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে বলে তারা মনে করে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আবাসন শিল্প জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। সরকার এমন একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে আবাসন উন্নয়ন হবে পরিকল্পিত, টেকসই এবং দুর্নীতিমুক্ত।
তিনি বলেন, নগরায়ণ শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক হলে চলবে না; দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কৃষিজমি সংরক্ষণ করে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার নিজে আবাসন ব্যবসা পরিচালনা করতে চায় না। বরং সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) ভিত্তিক প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি রিহ্যাবের উত্থাপিত যৌক্তিক প্রস্তাবগুলো ইতিবাচকভাবে বিবেচনার আশ্বাস দেন।













