পোশাক-টেক্সটাইল শিল্পে সংকট, গঠন হলো উচ্চপর্যায়ের কমিটি

DSJ Web Photo July 22 2026 Bgmea
ছবি- বিজিএমইএ

দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ জোগান দেওয়া তৈরি পোশাক ও প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্প একযোগে গভীর চাপের মুখে পড়েছে। জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদের ঋণ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ধীরগতির সরকারি সেবা, বন্দর জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারানোর আশঙ্কার মধ্যে একই দিনে প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হয়েছে খাতটির দুই শীর্ষ সংগঠন—বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)।

সংকট উত্তরণে তারা একগুচ্ছ নীতিগত সহায়তা ও জরুরি সরকারি হস্তক্ষেপ দাবি করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়গুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পৃথক উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বুধবার (২২ জুলাই) বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত পৃথক বৈঠকে উদ্যোক্তারা সতর্ক করে বলেন, দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত না হলে উৎপাদন, রপ্তানি ও নতুন বিনিয়োগ আরও চাপে পড়বে। বিশেষ করে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, স্বল্পসুদে অর্থায়ন, দ্রুত কাস্টমস ও ব্যাংকিং সেবা এবং রপ্তানি লজিস্টিকস সহজ না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এসব প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, অর্থ উপদেষ্টা, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন।

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বে সংগঠনটির পরিচালনা পর্ষদের প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বর্তমান চ্যালেঞ্জ, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার বিষয়গুলো তুলে ধরেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
বিজিএমইএ নেতারা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে শুধু কর ও শুল্ক সুবিধা নয়, উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে। এ জন্য সমন্বিত শুল্ক-কর নীতি, আর্থিক সহায়তা এবং রপ্তানিবান্ধব নীতিমালা প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

বৈঠকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় জ্বালানি সংকটের বিষয়টি। বিজিএমইএ নেতারা জানান, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি পণ্য জাহাজীকরণে সমস্যা তৈরি হচ্ছে এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করায় উৎপাদন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

এ পরিস্থিতিতে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে কাস্টমস, ব্যাংকিং, গ্যাস ও বিদ্যুৎসহ সব ধরনের সরকারি সেবা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি ফাস্ট ট্র্যাক সার্ভিস মেকানিজম চালুর দাবি জানানো হয়। এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ঘন ঘন বন্ড অডিটের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক মানের পেশাদার অডিট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বার্ষিক কাস্টমস অডিট চালুর প্রস্তাব দেয় বিজিএমইএ।

অন্যদিকে বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেলের নেতৃত্বে সংগঠনটির প্রতিনিধিদল দেশের প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্পের সংকট কাটাতে পাঁচ দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করে। তারা প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শুল্ক-কর কাঠামো, রপ্তানি সহায়ক নীতিমালা এবং আর্থিক সহায়তার দাবি জানান। পাশাপাশি রপ্তানিমুখী প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্পের বিদ্যমান ঋণের জন্য বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির আওতায় সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সুদহার নির্ধারণের প্রস্তাব দেন।

বিটিএমএ আরও জানায়, সরকার ঘোষিত ২০ হাজার কোটি টাকার চলতি মূলধন সহায়তা দ্রুত বাস্তবায়ন, প্রকল্পভিত্তিক সিআইবি মূল্যায়ন এবং বন্ধ বা আংশিক বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সিআইবি শিথিলতা দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রযুক্তি আধুনিকায়ন (বিএমআরই), জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে দীর্ঘমেয়াদি স্বল্পসুদে অর্থায়নের ব্যবস্থার দাবি জানানো হয়।

বৈঠকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্গো ধারণক্ষমতা বাড়াতে জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী কার্গো শেড নির্মাণ, গাজীপুরে শ্রমিকদের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণে সরকারি খাসজমি বরাদ্দ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) বাস্তবায়ন সহজ করা এবং বেনাপোল স্থলবন্দরে যৌথ সেবা ডেস্ক স্থাপনের দাবি জানায় বিজিএমইএ। বৈঠকে আগামী নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী বাটেক্সপো-২০২৬ উদ্বোধনে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হলে তিনি সম্মতি দেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উভয় সংগঠনের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের সঙ্গে এই শিল্পখাতের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। তাই উদ্যোক্তাদের উত্থাপিত বিষয়গুলো দ্রুত পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বিজিএমইএর উত্থাপিত বিষয়গুলো পর্যালোচনার জন্য বাণিজ্যমন্ত্রী, অর্থ উপদেষ্টা এবং বিজিএমইএ সভাপতিকে নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্যদিকে বিটিএমএর প্রস্তাব বাস্তবায়নে বাণিজ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে নিয়ে আরেকটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই কমিটি এক সপ্তাহের মধ্যে প্রথম বৈঠকে বসে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেবে।

বৈঠক শেষে বিটিএমএর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে ৫ কোটি টাকার চেক হস্তান্তর করা হয়। সংগঠনটি জানায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস কর্মসূচির জন্য এর আগেও ১ লাখ সেট স্কুল ড্রেস সরবরাহে ৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top