করের চাপ, অবৈধ সিগারেট নাকি ক্রেতার বদলে যাওয়া অভ্যাস?

DSJ Web Photo July 25 2026 BAT
ডিএসজে

বাংলাদেশের সিগারেট বাজারে একসময় প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানে থাকা ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) বাংলাদেশ এখন বহুমুখী চাপে পড়েছে। টানা কয়েক বছর ধরে বিক্রি কমছে কোম্পানিটির, সঙ্গে কমছে রাজস্ব ও মুনাফাও। প্রশ্ন উঠেছে—এই পতনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ কি সরকারের ধারাবাহিক কর বৃদ্ধি, অবৈধ সিগারেটের বিস্তার, নাকি উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে বদলে যাওয়া ভোক্তার আচরণ?

চলতি বছরের অর্ধবার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, সংকটটি কেবল একটি কোম্পানির নয়; এর প্রভাব পড়ছে সরকারের রাজস্ব, বৈধ তামাক বাজার এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপরও।

আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে বিএটি বাংলাদেশের সিগারেট বিক্রি নেমে এসেছে প্রায় ২ হাজার ৫২২ কোটি স্টিকে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪.৬ শতাংশ কম। বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়ায় নিট রাজস্বও কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ। কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয়ও (ইপিএস) কমেছে। আর্থিক প্রতিবেদনে এর প্রধান কারণ হিসেবে সরাসরি “ভলিউম ডি-গ্রোথ” বা বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পতনের সবচেয়ে বড় কারণ সরকারের ধারাবাহিক শুল্ক ও সম্পূরক কর বৃদ্ধি। গত দুই বছরে একাধিক দফায় সিগারেটের দাম বাড়ানো হয়েছে। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ধূমপায়ীদের একটি অংশ হয় সিগারেটের ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন, নয়তো তুলনামূলক কম দামের কিংবা কর ফাঁকি দেওয়া অবৈধ ব্র্যান্ডের দিকে ঝুঁকেছেন।

বিএটি বাংলাদেশের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিএটি বাংলাদেশের মোট সিগারেট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৭,১০২ কোটি স্টিক। যা পরের বছর ২০২৪ সালে ৩১৮ কোটি স্টিক কমে দাঁড়ায় ৬,৭৮৪ কোটি স্টিকে। ২০২৫ সালে এই নিম্নমুখী প্রবণতা আরও ভয়াবহ রূপ নেয় এবং এক বছরেই ১,৭৯৬ কোটি স্টিক বিক্রি কমে মোট ভলিউম ৪,৯৮৮ কোটি স্টিকে নেমে আসে। সিগারেটের এই ধারাবাহিক পতনের চিত্র ২০২৬ সালেও অব্যাহত রয়েছে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বৈধ কোম্পানিগুলোর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী এখন আর কেবল অন্য ব্র্যান্ড নয়, বরং কর না দেওয়া অবৈধ সিগারেট। এসব পণ্যের দাম বৈধ ব্র্যান্ডের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় বাজারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ধীরে ধীরে সেদিকে সরে যাচ্ছে। ফলে বৈধ উৎপাদক যেমন বিক্রি হারাচ্ছে, তেমনি সরকারও সম্পূরক শুল্ক, ভ্যাট ও আয়কর বাবদ সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিক্রি কমলেও উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু ভলিউম কমে যাওয়ায় সেই সাশ্রয়ের সুফল মুনাফায় প্রতিফলিত হয়নি। অর্থাৎ এখন কোম্পানির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উৎপাদন ব্যয় নয়, বরং বাজারে বিক্রির ধারাবাহিক সংকোচন।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে নিম্ন ও মধ্যমূল্যের সিগারেট সেগমেন্টে। কারণ এই শ্রেণির ক্রেতারাই মূল্যবৃদ্ধির প্রতি সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল। দাম বাড়লেই তারা সস্তা বিকল্প কিংবা অবৈধ বাজারে চলে যান। অন্যদিকে প্রিমিয়াম সেগমেন্টের ক্রেতাদের মধ্যে এমন পরিবর্তন তুলনামূলক কম দেখা গেলেও তাদের অনেকেই এখন সেগমেন্ট পরিবর্তন করছেন কিংবা ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন।

এ পরিস্থিতির প্রভাব শুধু কোম্পানির আয়েই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের তামাক খাত দীর্ঘদিন ধরে সরকারের অন্যতম বড় রাজস্ব উৎস। বৈধ বিক্রি কমতে থাকলে সম্পূরক শুল্ক, ভ্যাট এবং কর আদায়ও কমে যাবে। অর্থাৎ রাজস্ব বাড়ানোর উদ্দেশ্যে কর বৃদ্ধি করা হলেও অতিরিক্ত করের কারণে যদি বৈধ বাজার ছোট হয়ে যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে সরকার প্রত্যাশিত রাজস্ব নাও পেতে পারে।

সামনের দিনগুলোতে বিএটির জন্য আরও কয়েকটি ঝুঁকি রয়েছে। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন আরও কঠোর হওয়ার সম্ভাবনা, কৃষিজমিতে তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করার উদ্যোগ, অবৈধ সিগারেট দমনে সীমিত অগ্রগতি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ—সব মিলিয়ে কোম্পানির জন্য বাজার পুনরুদ্ধার সহজ হবে না। পাশাপাশি প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার করসংক্রান্ত মামলাও কোম্পানির অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে রেখেছে।

বিনিয়োগকারীদের জন্য বার্তাটিও স্পষ্ট। বিএটি বাংলাদেশ এখনও শক্তিশালী নগদ প্রবাহ ও লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষম কোম্পানি হলেও টানা বিক্রি কমে যাওয়া ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ফলে শুধু মুনাফা নয়, বাজারের আকার, করনীতি, অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ এবং ভোক্তার আচরণের পরিবর্তন—এই চারটি বিষয়ই এখন কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ মূল্যায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠেছে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top