চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং জ্বালানি খাতের সক্ষমতা বাড়াতে বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা পাচ্ছে বাংলাদেশ। জাপান এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) সঙ্গে মোট ৫৬৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পৃথক দুটি বাজেট সহায়তা চুক্তি সই হয়েছে। এর মধ্যে জাপানের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে ৩১৪ মিলিয়ন ডলার এবং এআইআইবি ঋণ হিসেবে জোগান দিচ্ছে ২৫০ মিলিয়ন ডলার।
আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই কৌশলগত অর্থায়নের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইআরডি জানিয়েছে, বাংলাদেশ সরকার এবং জাপান সরকারের মধ্যে ‘ইমার্জেন্সি অ্যাসিস্ট্যান্স লোন ফর স্ট্রেংথেনিং ইকোনমিক রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড এনশিওরিং স্ট্যাবল এনার্জি সাপ্লাই’ শীর্ষক একটি ঋণ চুক্তি সই হয়েছে। ঢাকার শেরেবাংলা নগরের ইআরডি কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী এবং জাপানের পক্ষে বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানি রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি ও জাইকা বাংলাদেশের প্রধান প্রতিনিধি তাকাহাশি জুনকো এই চুক্তিতে সই করেন। চুক্তির আওতায় জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি (জাইকা) বাজেট সহায়তা হিসেবে ৫০ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন (প্রায় ৩১৪ মিলিয়ন ডলার বা ৩,৮৫০ কোটি টাকা) প্রদান করবে।
এই ঋণ কর্মসূচিটি মূলত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় বাস্তবায়িত ‘স্ট্রেংথেনিং ইকোনমিক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড গভর্নেন্স প্রোগ্রাম (সাবপ্রোগ্রাম-২)’-এর একটি অংশ। এর প্রধান লক্ষ্য হলো দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংস্কার জোরদার করা, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং জাতীয় জ্বালানি খাতে টেকসই স্থিতিশীলতা আনা। জাপানের এই মেয়াদি ঋণের সুদের হার ধরা হয়েছে ৩.০৫ শতাংশ, যা ১০ বছরের রেয়াতকাল বা গ্রেস পিরিয়ডসহ আগামী ৩০ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। জাইকার এই ঋণে গ্র্যান্ট এলিমেন্ট বা অনুদানের অংশ ২৪ দশমিক ০১ শতাংশ প্রাক্কলন করায় এটিকে তুলনামূলকভাবে বেশ রেয়াতি বা সহজ শর্তের ঋণ হিসেবে বিবেচনা করছে ইআরডি।
অন্যদিকে, একই কর্মসূচির আওতায় এডিবির সহ-অর্থায়নকারী হিসেবে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) সঙ্গে আরও ২৫০ মেগা মার্কিন ডলারের একটি পৃথক বাজেট সহায়তা চুক্তি গতদিন অনলাইনের মাধ্যমে সই হয়েছে। তবে জাইকার ঋণের তুলনায় এআইআইবির এই ঋণের শর্ত ও সুদের হার কিছুটা চড়া। এই ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট বা এসওএফআর প্লাস ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিলের এসওএফআর সূচক (৩.৬৩ শতাংশ) অনুযায়ী বর্তমানে এই ঋণের সুদের হার দাঁড়ায় প্রায় ৫.০৮ শতাংশ। ৫ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ এই ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ৩৫ বছর এবং এতে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ ফ্রন্ট-এন্ড ফি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ইআরডির অভ্যন্তরীণ আর্থিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এআইআইবির এই ঋণের গ্র্যান্ট এলিমেন্ট ঋণাত্মক বা মাইনাস শূন্য দশমিক ৬৮ শতাংশ হওয়ায় এটি মূলত একটি কঠিন বা অ-রেয়াতি ঋণ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, করোনা মহামারি পরবর্তী ধাক্কা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতি তীব্র বাহ্যিক চাপের মুখে পড়েছে। এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নতুন এই বড় অংকের বাজেট সহায়তা সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে এবং চলমান কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচিগুলো টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে এই কর্মসূচির অধীনে জ্বালানি খাতে গৃহীত বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপের ফলে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে, যা দেশের সাধারণ পরিবার এবং শিল্পকারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বড় ধরনের সহায়ক হবে।













