চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে তীব্র অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, অনিয়ম ও গ্রাহক আন্দোলনের জেরে নজিরবিহীন তারল্য সংকটে পড়েছে দেশের বেসরকারি খাতের বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ব্যাংকটি থেকে আতঙ্কিত গ্রাহকদের আমানত তুলে নেওয়ার হিড়িক পড়েছে, যার ফলে গত এক সপ্তাহে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এমন তীব্র সংকটজনক পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের দৈনন্দিন নগদ টাকার চাহিদা সামাল দিতে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিধিবদ্ধ নগদ জমা বা সিআরআর ঘাটতি মেটাতে আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ জরুরি ধার চেয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী ১০ হাজার কোটি টাকা বিশেষ তারল্য সহায়তা চাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ইসলামী ব্যাংক বড় অঙ্কের এই ফান্ড চেয়ে আবেদন করেছে, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এখনও টাকা দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
ইসলামী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র নিশ্চিত করেছে, গত ৩১ মে থেকে ৭ জুন পর্যন্ত মাত্র ৫ কর্মদিবসে ব্যাংকটির আমানত কমেছে ৪ হাজার ২০৪ কোটি টাকা, যার পর গত দুই দিনে জমার চেয়ে উত্তোলনের পরিমাণ আরও জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। একসময়ের উদ্বৃত্ত থাকা ব্যাংকটির চলতি হিসাবের স্থিতি ৭ হাজার ১৫ কোটি টাকা থেকে আশঙ্কাজনকভাবে কমে বর্তমানে মাত্র ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
এই চরম অস্থিরতার সূত্রপাত হয় পবিত্র ঈদুল আজহার ঠিক আগে, যখন বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নিযুক্ত স্বতন্ত্র পরিচালক ও তৎকালীন চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। একই দিন রাত ৯টায় এক জরুরি আদেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক বিতর্কিত ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগের পর থেকেই ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’ ও ‘গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে একদল গ্রাহক খুরশীদ আলমের অপসারণের দাবিতে রাজধানীর দিলকুশায় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে টানা ৯ দিন ধরে তীব্র বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, খুরশীদ আলম কেন্দ্রীয় ব্যাংকে থাকাকালীন নানা আর্থিক দুর্নীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের তীব্র ক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
আজ নবম দিনের মতো চলা এই কর্মসূচিতে শতাধিক নারী আমানতকারী অংশ নিয়ে তাদের আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন, যা সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গ্রাহকদের এই আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
আন্দোলনরত গ্রাহক ও সচেতন ফোরামের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—বিতর্কিত নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিল, সাবেক এমডি ওমর ফারুক খানকে পদে পুনর্বহাল, ব্যাংক রেজোলিউশন অ্যাক্ট থেকে ১৮ (ক) ধারা বাতিল এবং বিগত সময়ে ব্যাংক লুটপাটের সঙ্গে জড়িত কাউকে পর্ষদে না রাখা। এছাড়া এস আলম গ্রুপের দখল করা সব মালিকানা ও সম্পত্তি বিক্রি করে ইসলামী ব্যাংক থেকে লুট করা অর্থের দ্রুত সমন্বয় করার দাবিও জানানো হয়েছে।
২০১৭ সালে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ও তৎকালীন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় নামে-বেনামে শেয়ার কিনে ইসলামী ব্যাংক জোরপূর্বক দখল করেছিল এস আলম গ্রুপ। ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকটি এস আলমের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিনিধি পাঠিয়ে পর্ষদ পুনর্গঠন করে। তবে এস আলম আমলের সুদীর্ঘ নজিরবিহীন ঋণ কেলেঙ্কারি ও লুটপাটের কারণে একসময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী এই ব্যাংকটির প্রায় ৫০ শতাংশ ঋণই খেলাপি হয়ে পড়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলা এই প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসযজ্ঞের খেসারত হিসেবেই ব্যাংকটি এখন বারবার তীব্র নগদ টাকার সংকটে পড়ছে।













