দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর উচ্চ মূল্যস্ফীতির ক্রমবর্ধমান চাপ এবং কয়েকটি ব্যাংকের পর্ষদ পরিবর্তনজনিত অস্থিরতার কারণে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে মানুষের হাতে নগদ অর্থ জমার পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের মার্চ মাস শেষে ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে থাকা মুদ্রার পরিমাণ এক লাফে ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে শুরু করে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত মাত্র চার মাসের ব্যবধানে ব্যাংক থেকে গ্রাহকরা প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি নগদ অর্থ তুলে নিয়েছেন, যা দেশের ব্যাংকিং খাতের তারল্য ব্যবস্থাপনায় নতুন করে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬ সালের শুরু থেকেই ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ ধরে রাখার এই প্রবণতা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। গত বছরের ডিসেম্বরে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ যেখানে ছিল ২ লাখ ৭৫ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা, চলতি বছরের জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকায়। এরপর ফেব্রুয়ারিতে তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে ২ লাখ ৮৬ হাজার ৪০৪ কোটি টাকায় পৌঁছায় এবং সর্বশেষ মার্চ মাসে মাত্র ৩০ দিনের ব্যবধানে রেকর্ড ১৬ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা উত্তোলনের মাধ্যমে তা ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি টাকার সর্বোচ্চ চূড়া স্পর্শ করে।
মানুষ ব্যাংক থেকে যে পরিমাণ নগদ টাকা তুলে নেওয়ার পর তা আর ব্যাংকিং চ্যানেলে পুনরায় জমা করে না, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিভাষায় সেটাই মূলত ‘ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকা’ হিসেবে পরিচিত। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের বাইরে চলে যাওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সামগ্রিক মুদ্রানীতি পরিচালনাকে চরম জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষ করে বাজার থেকে অতিরিক্ত তারল্য চুষে নেওয়া, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের স্বাভাবিক গতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে এটি বড় ধরনের আইনি ও লজিস্টিকস প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মূলত দুটি সুনির্দিষ্ট কারণে মানুষ হঠাৎ করে ব্যাংক থেকে নগদ টাকা তুলে নিজের কাছে রাখতে বেশি নিরাপদ মনে করছে। প্রথমত, বাজারে লাগামহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে, ফলে খরচের চাহিদা মেটাতে তারা ব্যাংক থেকে বেশি টাকা তুলে রাখছে। দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা স্তরে বড় ধরনের পরিবর্তনের কারণে গ্রাহকদের বড় একটি অংশের মধ্যে নতুন করে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, মানুষ যদি এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সাময়িক অস্থিরতার কারণে তুলে থাকে এবং পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে তা আবারও অন্য কোনো ভালো ব্যাংকে জমা করে, তবে অর্থনীতির ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব কিছুটা কম হবে। তবে এই টাকা ঘরে রাখার প্রবণতা যদি সামনের মাসগুলোতেও এভাবে অবিরত থাকে, তবে তা নিশ্চিতভাবেই পুরো আর্থিক খাতের জন্য অত্যন্ত চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। উদ্ভূত পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিচ্ছে, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ নীতিগত সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে অত্যন্ত কড়া ও সতর্ক দৃষ্টি রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঐতিহাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলজুড়ে নজিরবিহীন অনিয়ম, জালিয়াতি ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাংক লুটপাটের কারণে দেশের আর্থিক খাতের ওপর মানুষের আস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। তখন আতঙ্কিত গ্রাহকেরা দলে দলে আমানত তুলে ঘরে রাখা শুরু করলে ব্যাংকগুলোতে তীব্র তারল্য সংকট দেখা দেয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর সংস্কারের মুখে সেপ্টেম্বর থেকে ব্যাংকিং খাতে মানুষের আস্থা ফিরতে শুরু করে এবং ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা কয়েক মাস ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে থাকে।
তবে ২০২৫ সালের শেষের দিক থেকে বাজারে নিত্যপণ্যের চড়া দামের কারণে মূল্যস্ফীতি আবারও রেকর্ড ভাঙতে শুরু করলে এবং বেশ কিছু ব্যাংকের তারল্য ঘাটতির খবর ছড়ালে গ্রাহকদের টাকা তোলার সেই পুরনো আতঙ্ক নতুন করে ফিরে আসে। এদিকে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে দেশের বাজারে নতুন টাকা ছাপানোর তথা মোট মুদ্রা সরবরাহের (রিজার্ভ মানি) পরিমাণও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে চলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে ব্যাংক খাতে ছাপানো টাকার স্থিতি যেখানে ছিল ৪ লাখ ২৪ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা, মার্চ মাস শেষে তা এক লাফে ১৮ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা বেড়ে ৪ লাখ ৪৩ হাজার ২৬৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির আগুনে নতুন করে ঘি ঢালতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।













