কৃষিতে বড় অর্থায়নের পথে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে মোট ১৩ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা সামনে এসেছে।
এর মধ্যে উত্তরবঙ্গে কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে রয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকার তহবিল। আর দেশের কৃষি উৎপাদন ও পল্লি অর্থনীতি শক্তিশালী করতে রয়েছে আরও ১০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম।
দুটি স্কিমের অর্থায়ন কাঠামোতেও মিল রয়েছে। অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৩ শতাংশ সুদে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা পাবে। কৃষক বা গ্রাহক পর্যায়ে সুদ বা মুনাফার হার সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়নের ক্ষেত্রেও মুনাফার হার ৭ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।
উত্তরবঙ্গের ৩ হাজার কোটি টাকার তহবিলের উদ্দেশ্য শুধু কৃষিতে ঋণ দেওয়া নয়। কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র তৈরির মাধ্যমে কৃষিকে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত করাই এর লক্ষ্য।
এই তহবিলের আওতায় গ্রাহক পর্যায়ের ঋণ বা বিনিয়োগের মেয়াদ প্রকল্পভেদে ১৮ থেকে সর্বোচ্চ ৩৬ মাস হতে পারবে। কোনো ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩ মাস এবং কোনো ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ডের সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে ১০ হাজার কোটি টাকার স্কিমের লক্ষ্য আরও বিস্তৃত। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পল্লি অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে।
দুটি স্কিমেই ব্যাংককে শুধু ঋণ বিতরণ করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। ৭ শতাংশ সুদ বা মুনাফায় ঋণ দেওয়ার তথ্য শাখার ভেতরে ও বাইরে দৃশ্যমান স্থানে প্রচার করতে হবে। ১০ হাজার কোটি টাকার স্কিমের ক্ষেত্রেও কৃষক পর্যায়ে ৭ শতাংশ হারে অর্থায়নের তথ্য প্রচারের নির্দেশ রয়েছে।
তহবিলের অর্থ ব্যবহারে রয়েছে কঠোর নজরদারি। নির্ধারিত উদ্দেশ্যের বাইরে অর্থ ব্যবহার হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ৩ হাজার কোটি টাকার স্কিমে অর্থের অপব্যবহার বা ৭ শতাংশের বেশি সুদ বা মুনাফা আদায়ের প্রমাণ পাওয়া গেলে নির্ধারিত হারের অতিরিক্ত ২ শতাংশ সুদ বা মুনাফা এককালীনভাবে আদায়ের বিধান রয়েছে।
১০ হাজার কোটি টাকার স্কিমেও অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যাংককে নিয়মিত তদারকি করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজন মনে করলে ব্যাংক শাখা ও ঋণগ্রহীতার প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করতে পারবে। ঋণের অর্থ অপব্যবহার বা নীতিমালার শর্ত লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে পুনঃঅর্থায়নের অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছ থেকে অতিরিক্ত ২ শতাংশ সুদে আদায়ের বিধান রয়েছে।
১০ হাজার কোটি টাকার স্কিমে কৃষক বা গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ বিতরণের পাশাপাশি ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ঋণ আদায়ের দায়িত্বও স্পষ্ট করা হয়েছে। গ্রাহক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশন রাখতে হবে।
সব মিলিয়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার এই অর্থায়ন উদ্যোগ কৃষিকে শুধু উৎপাদনের পর্যায়ে নয়, বৃহত্তর গ্রামীণ অর্থনীতির অংশ হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার একটি বড় পদক্ষেপ। তবে এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে অর্থায়ন কতটা দ্রুত প্রকৃত কৃষক ও উদ্যোক্তার কাছে পৌঁছায় এবং ঋণের অর্থ কতটা কার্যকরভাবে নির্ধারিত কাজে ব্যবহার হয় তার ওপর।
১৩ হাজার কোটি টাকার এই অর্থায়নের বড় পরীক্ষা তাই অর্থ ছাড় নয়; কৃষকের উৎপাদন, গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে এর বাস্তব প্রভাব কতটা পড়ে, সেটিই হবে মূল মাপকাঠি।











