উত্তরাঞ্চলের কৃষিকে শুধু উৎপাদননির্ভর না রেখে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত করে একটি সমন্বিত কৃষিপণ্য মূল্যশৃঙ্খল গড়ে তুলতে ৩ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই তহবিল থেকে কৃষক ও কৃষিভিত্তিক শিল্প উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদ বা মুনাফা হারে অর্থায়ন পাবেন।
তহবিলের আওতায় শুধু কৃষি উৎপাদন নয়, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, আধুনিক হিমাগার, গুদাম, সাইলো, কোল্ড চেইন, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, পরিবহন, বাজারজাতকরণ এবং রপ্তানিমুখী কার্যক্রমে অর্থায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে মাঠের উৎপাদন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত কৃষির পুরো ধারাটিকে অর্থায়নের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
উৎপাদনের পর নষ্ট হওয়া ঠেকাতে বিনিয়োগ
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, উত্তরাঞ্চলে কৃষিপণ্যের উৎপাদন তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং কার্যকর পরিবহনব্যবস্থার অভাবে উৎপাদিত পণ্যের একটি অংশ নষ্ট হয়ে যায়। আবার সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় কৃষকদের অনেক সময় ফসল কম দামে বিক্রি করতে হয়।
এই সমস্যা মোকাবিলায় নতুন তহবিলের অর্থে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব হিমাগার, বীজ সংরক্ষণাগার, গুদাম, খাদ্যশস্য সংরক্ষণাগার, সাইলো এবং কোল্ড চেইন লজিস্টিকস গড়ে তোলার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এর পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নেও অর্থায়ন করা হবে। অর্থাৎ কৃষকের উৎপাদিত পণ্য যাতে দ্রুত ও নিরাপদে সংরক্ষণ করে উপযুক্ত বাজারে নেওয়া যায়, সেই অবকাঠামো তৈরিতেও তহবিলটি ব্যবহার করা যাবে।
কোন খাতে কত ঋণ
তহবিলের আওতায় কৃষি উৎপাদন খাতে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা ঋণ নিতে পারবেন।
কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও অবকাঠামো খাতে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ৪০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পাবেন। একইভাবে কৃষি ও কৃষিভিত্তিক পণ্য উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতেও সর্বোচ্চ ৪০ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থায়নের সুযোগ থাকবে।
আর কৃষিপণ্য ও কৃষিভিত্তিক পণ্য রপ্তানি খাতে সর্বোচ্চ ১৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ বা বিনিয়োগ সুবিধা দেওয়া যাবে।
গ্রাহক পর্যায়ে এসব ঋণের সর্বোচ্চ সুদ বা মুনাফার হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ শতাংশ।
কৃষিভিত্তিক শিল্প ও রপ্তানিতে জোর
নতুন তহবিলের আওতায় কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা এবং কৃষিজাত পণ্যে মূল্য সংযোজনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উৎপাদিত কৃষিপণ্য সরাসরি বিক্রির পরিবর্তে তা প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করা গেলে কৃষক ও উদ্যোক্তা উভয়ের জন্যই বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে রপ্তানিমুখী কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে অর্থায়নের সুযোগ থাকায় উত্তরাঞ্চলের উৎপাদিত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে নেওয়ার সক্ষমতাও বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশা, এ ধরনের অর্থায়নের ফলে কৃষিপণ্যে মূল্য সংযোজন বাড়বে, কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশ ঘটবে এবং গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় বাড়বে। পাশাপাশি কৃষিপণ্যের রপ্তানি সক্ষমতাও শক্তিশালী হবে।
১৬ জেলায় কার্যক্রম
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নতুন পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের মেয়াদ হবে সার্কুলার জারির তারিখ থেকে তিন বছর। তহবিলটির কার্যক্রম রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায় সীমাবদ্ধ থাকবে।
অর্থাৎ উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসার জন্য নির্ধারিত এই তহবিল থেকে ওই দুই বিভাগের আওতাভুক্ত জেলাগুলোর কৃষক, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অর্থায়নের সুযোগ পাবে।
শুরুতেই ৩৮ ব্যাংক যুক্ত
তহবিলটি বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে ৩৮টি ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের চুক্তি হয়েছে। গত ৩১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি সই করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ।
৩ হাজার কোটি টাকার এই পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, উৎপাদিত পণ্যের পরবর্তী ধাপগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ঘাটতি কমানো গেলে কৃষকের পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি এবং মৌসুমি কম দামে বিক্রির চাপ কমতে পারে।
ফলে কৃষিকে কেন্দ্র করে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও রপ্তানির নতুন ব্যবসা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলে একটি শক্তিশালী কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে।











