সময়মতো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কারণে অর্থনীতি কতটা ক্ষতির মুখে পড়েছে, আর ভুল সিদ্ধান্তের বোঝা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কতটা বহন করতে হচ্ছে—এবার সেই হিসাব করার তাগিদ দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
বিশেষ করে জ্বালানি খাতে অতীতের নীতিগত ব্যর্থতার কারণে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হয়েছে, তা ‘কস্ট অব ইনঅ্যাকশন’ হিসেবে নিরূপণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
একই সঙ্গে ভুল নীতির কারণে সৃষ্ট ঋণের দায়কেও আলাদাভাবে চিহ্নিত করে গবেষণার মাধ্যমে তার অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণের কথা বলেছেন উপদেষ্টা।
রাজধানীর পল্টনে ইকনোমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) মিলনায়তনে ‘অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ও উদীয়মান চ্যালেঞ্জ: আগামীর অগ্রাধিকার’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন তিনি। ইআরএফ আয়োজিত এ সেমিনারে সহযোগিতা করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের জন্য বর্তমান সরকারের কোনো দায় নেই। আগের সরকারের সময়ে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা বাড়ানো, দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নেওয়া এবং জ্বালানি খাতে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হওয়ার কারণেই বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে।
তার মতে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে সময়মতো প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হলে বর্তমান পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব ছিল। কিন্তু সে ধরনের উদ্যোগ না নেওয়ার ফলে শুধু জ্বালানি সংকটই তৈরি হয়নি, এর প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানেও।
এ ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের জন্য তিনি ‘কস্ট অব ইনঅ্যাকশন’ বা সিদ্ধান্ত না নেওয়ার অর্থনৈতিক ব্যয় হিসাব করার ওপর জোর দেন। অর্থাৎ অতীতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হলে যে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারত, সিদ্ধান্তহীনতার কারণে তার কতটা হারিয়েছে—সেই ক্ষতির একটি অর্থনৈতিক হিসাব তৈরি করতে হবে।
শুধু সিদ্ধান্ত না নেওয়ার ক্ষতি নয়, ভুল সিদ্ধান্তের কারণে যে আর্থিক দায় তৈরি হয়েছে, তারও পূর্ণাঙ্গ হিসাব করার আহ্বান জানান উপদেষ্টা। তাঁর মতে, ভুল নীতির কারণে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর যে ঋণের বোঝা তৈরি হয়েছে, সেটিকে ‘কস্ট অব রং ডুইং’ হিসেবে গবেষণার আওতায় আনা প্রয়োজন।
এ জন্য অর্থনীতি সমিতি ও দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি পূর্ণাঙ্গ গবেষণার আহ্বান জানান তিনি।
সংকট সামলে ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা
অতীতের সংকটের দায় তুলে ধরার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের উদ্যোগের কথাও জানান উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, সরকার শুধু অতীতে তৈরি হওয়া সমস্যা মোকাবিলা করছে না; ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে এগোচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পাশাপাশি রাজস্ব, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানেও অতীতের ক্ষতি কাটিয়ে জবাবদিহিতামূলক, কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলাকে সরকারের লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর লক্ষ্য ৬ শতাংশ
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, অতীতে লুটপাট, দুর্নীতি এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব এখনো রয়েছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের কিছুটা বেশি থাকলেও সরকারের লক্ষ্য তা ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা।
তিনি বলেন, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে শুধু মূল্যস্ফীতি কমানো যথেষ্ট নয়; উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পরিবেশও তৈরি করতে হবে। এ জন্য অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে কাঠামোগত পরিবর্তন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নতুন বেতন কাঠামোর অর্থ কোথা থেকে
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে—এ বিষয়েও কথা বলেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, রাজস্ব আদায় বাড়ানোর মাধ্যমে এ অর্থের সংস্থান করা হবে। কর ফাঁকি বন্ধের পাশাপাশি আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর থেকে রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু খাতেও রাজস্ব বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক বা কোনো টাস্কফোর্সের পরামর্শ অনুসরণ করেই সরকার এগোচ্ছে না; বরং দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিজেদের কৌশল নির্ধারণ করা হচ্ছে। অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের রাজস্ব আদায়ের চিত্রও জনসমক্ষে তুলে ধরা হবে বলে জানান তিনি।
টাকা পাচার ও চাঁদাবাজির প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে
সেমিনারে দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিনের লুটপাট ও অর্থপাচারের প্রভাব নিয়েও আলোচনা হয়।
অর্থনীতি সমিতির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ডলারে পাচার হয়েছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রায় দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পাচার করা অর্থের টাকার অংশ দেশের ভেতরেই থেকে গেছে। এ অর্থের প্রবাহ মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, অর্থনীতিতে চাঁদাবাজিরও নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। ব্যবসা পরিচালনায় বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হলে সেটি শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম ও উৎপাদন ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি করে। অর্থাৎ চাঁদাবাজিও এক ধরনের করের মতো কাজ করে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
মাহবুব উল্লাহর মতে, শুধু নীতি পরিবর্তন বা বিচ্ছিন্ন সংস্কার দিয়ে অর্থনীতির কাঠামোগত সমস্যা সমাধান করা যাবে না। লুটপাট, অবৈধ অর্থ স্থানান্তর ও অনুৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের যে কাঠামো তৈরি হয়েছে, সেটিতে পরিবর্তন আনতে হবে।
বিনিয়োগে আস্থা ফেরেনি
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কিছুটা ফিরলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি। এ কারণে বিনিয়োগে প্রত্যাশিত গতি দেখা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি হলেও উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং জ্বালানি পরিস্থিতি এখনো স্বস্তিদায়ক নয়।
বিশেষ করে জ্বালানিতে আমদানিনির্ভরতা কমানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, অর্থনীতির বিদ্যমান সমস্যাগুলো শুধু সাময়িক পদক্ষেপে সমাধান হবে না; কাঠামোগত ও গভীর সংস্কার প্রয়োজন।
জ্বালানি সংকটে বাড়ছে শিল্পের ব্যয়
এফবিসিসিআইর প্রশাসক ও বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, জ্বালানি সংকটের মধ্যেও দেশের রপ্তানি খাতের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা বড় অর্জন। তবে গ্যাসের সংকটের কারণে অনেক শিল্পকারখানাকে ডিজেল বা জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে বন্ধ থাকা কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কিছু আবার চালু করা যেতে পারে। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহের সুযোগ তৈরি হবে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালা। সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।











