ছোট ব্যবসার ওপর করের চাপ কমাল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এখন থেকে বছরে সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন বা টার্নওভার করা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিকে কোনো টার্নওভার কর দিতে হবে না। একই সঙ্গে ২ কোটি থেকে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত বার্ষিক টার্নওভারের ক্ষেত্রে করের হার অর্ধেক কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
তবে ৪ কোটি টাকার বেশি বার্ষিক টার্নওভার করা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির জন্য ন্যূনতম টার্নওভার করের হার আগের মতোই ১ শতাংশ থাকছে।
এ–সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে এনবিআর। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে ছোট ও মাঝারি ব্যবসার ওপর থাকা টার্নওভার করের চাপ কিছুটা কমল। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের মুনাফার হার কম, তাদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে বেশি স্বস্তি দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এত দিন কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বেশির ভাগ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিকে তাদের বার্ষিক টার্নওভারের ওপর ন্যূনতম ১ শতাংশ হারে কর দিতে হতো। ব্যবসা লাভে থাকুক কিংবা লোকসানে—এই কর পরিশোধ করতে হতো। ফলে কম মুনাফার ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রকৃত বা কার্যকর করের বোঝা বেড়ে যেত। এমনকি কোনো প্রতিষ্ঠান লোকসান করলেও শুধু টার্নওভারের ভিত্তিতে কর দিতে হতো।
নতুন সিদ্ধান্তে সেই ব্যবস্থায় প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে ছাড় দেওয়া হলো।
এনবিআরের একজন কর্মকর্তা বলেন, ছোট ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দেওয়ার লক্ষ্যেই টার্নওভার করের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর ফলে ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিকভাবে কিছুটা সুবিধা পাবে।
কত টার্নওভারে কত কর
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, বছরে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কোম্পানি টার্নওভার কর থেকে পুরোপুরি অব্যাহতি পাবে।
বার্ষিক টার্নওভার ২ কোটি টাকার বেশি কিন্তু ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত হলে পুরো টার্নওভারের ওপর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক টার্নওভার ৩ কোটি টাকা হলে পুরো ৩ কোটি টাকার ওপর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ হারে কর হিসাব হবে।
আর বার্ষিক টার্নওভার ৪ কোটি টাকার বেশি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা কোম্পানিকে ১ শতাংশ হারে ন্যূনতম টার্নওভার কর দিতে হবে।
অর্থাৎ নতুন ব্যবস্থায় মূলত ছোট ব্যবসাকে টার্নওভার করের আওতা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে এবং অপেক্ষাকৃত মাঝারি আকারের ব্যবসার ক্ষেত্রে করের হার কমানো হয়েছে। তবে বড় টার্নওভার করা প্রতিষ্ঠানের জন্য আগের ১ শতাংশ হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের দাবির পর করছাড়
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই টার্নওভার করের এই কাঠামো পরিবর্তনের দাবি ছিল। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সম্প্রতি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির ওপর আরোপিত ১ শতাংশ ন্যূনতম টার্নওভার করব্যবস্থা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার দাবি জানিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়।
একই দাবিতে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিও অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়।
ব্যবসায়ীদের যুক্তি ছিল, টার্নওভার কর লাভের ওপর নয়, ব্যবসার মোট লেনদেনের ওপর আরোপ করা হয়। ফলে মুনাফার হার কমে গেলে বা ব্যবসায় লোকসান হলেও প্রতিষ্ঠানকে কর দিতে হয়। এতে কম মুনাফার ব্যবসাগুলোর ওপর কার্যকর করের চাপ বেড়ে যায়।
বিশেষ করে যেসব ব্যবসায় পণ্যের ক্রয়-বিক্রয়ের পর প্রকৃত মুনাফার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম, তাদের জন্য টার্নওভারভিত্তিক ১ শতাংশ কর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এনবিআরের নতুন সিদ্ধান্তে সেই চাপের একটি অংশ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হলো।
সব খাতে একই হার নয়
আয়কর আইনের ১৬৩ ধারায় টার্নওভার করের বিধান রয়েছে। তবে সব ব্যবসার জন্য একই হারে এই কর প্রযোজ্য নয়। নির্দিষ্ট কিছু খাতের জন্য আইনে আলাদা হার নির্ধারিত রয়েছে।
সিগারেট, বিড়ি ও তামাকজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে টার্নওভার করের হার ৩ শতাংশ। কার্বোনেটেড বেভারেজ ও মিষ্টি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই হার আড়াই শতাংশ। আর মোবাইল ফোন অপারেটরদের জন্য টার্নওভার করের হার দেড় শতাংশ।
নতুন প্রজ্ঞাপনের পরিবর্তন মূলত এসব বিশেষ হারের খাতের বাইরে থাকা অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির জন্য প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ বিশেষ হারে কর দেওয়া খাতগুলোর করহার এতে পরিবর্তিত হচ্ছে না।
নতুন শিল্পেও বিশেষ সুবিধা বহাল
শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পর প্রথম তিন বছর পর্যন্ত বিশেষ সুবিধার বিধানও বহাল রয়েছে। এ সময়ে ১ শতাংশের পরিবর্তে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ হারে টার্নওভার কর দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ফলে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য বিদ্যমান এই ছাড়ের পাশাপাশি ছোট ব্যবসাগুলোর জন্য নতুন করে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভার কর অব্যাহতি এবং ২ থেকে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত কম হারের ব্যবস্থা চালু হলো।
সব মিলিয়ে নতুন কাঠামোর মাধ্যমে এনবিআর ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে টার্নওভার করের চাপ কমানোর পাশাপাশি মাঝারি ব্যবসার জন্যও করহার কমিয়েছে। তবে ৪ কোটি টাকার বেশি টার্নওভার করা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আগের ১ শতাংশ ন্যূনতম করব্যবস্থা বহাল রেখেছে।













