হাজার কোটি টাকার ঋণও এখন এক দশকে শোধ করতে হবে না। বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য ঋণ পরিশোধের সময় আরও পাঁচ বছর বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১৫ বছর করার সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সঙ্গে থাকছে সর্বোচ্চ দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড।
শুধু নতুন ঋণগ্রহীতাই নয়, এর আগে বিশেষ সুবিধায় ১০ বা ১২ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফসিল করা প্রতিষ্ঠানগুলোরও নির্দিষ্ট শর্তে আবার আবেদন করে মেয়াদ ১৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে ব্যাংকিং খাতে বড় ঋণের বোঝা কমাতে আরও দীর্ঘ সময় পাচ্ছেন সবচেয়ে বড় ঋণগ্রহীতারা।
ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা ও আর্থিক কাঠামো পুনর্গঠনে দেওয়া নীতিসহায়তার মেয়াদ বাড়িয়ে সোমবার (৩১ আগস্ট) নতুন নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনায় ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় ডাউনপেমেন্ট গ্রহণের পর এসব আবেদন ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে।
নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা প্রযোজ্য হবে এমন ঋণগ্রহীতাদের জন্য, যাদের একক প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপ হিসেবে ঋণস্থিতি ১ হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে বলা হয়েছে, ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে এ ধরনের ঋণ হিসাব বিশেষ পুনঃতফসিলের আওতায় সর্বোচ্চ দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১৫ বছর মেয়াদে পুনঃতফসিল করা যাবে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অশ্রেণিকৃত ঋণ—অর্থাৎ এসটিডি-০, এসটিডি-১, এসটিডি-২ ও এসএমএ পর্যায়ের ঋণ—বিশেষ পুনর্গঠন সুবিধা পেতে পারে। আর বিরূপভাবে শ্রেণিকৃত সাব-স্ট্যান্ডার্ড, সন্দেহজনক এবং মন্দ বা ক্ষতিজনক ঋণ বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধার আওতায় আসবে।
অর্থাৎ খেলাপি হয়ে যাওয়ার আগেই বড় ঋণগ্রহীতার ব্যবসা পুনর্গঠনের একটি পথ খোলা থাকছে। আবার ইতোমধ্যে খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত ঋণের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি পুনঃতফসিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো একদিকে ক্ষতিগ্রস্ত ঋণ হিসাব থেকে অর্থ আদায়ের সম্ভাবনা বাড়াতে পারবে, অন্যদিকে ঋণগ্রহীতাদের ব্যবসা সচল রেখে কিস্তি পরিশোধের সময় বাড়ানোর সুযোগ দিতে পারবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সুবিধা শুধু নতুন আবেদনকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ নীতিসহায়তা বা বাছাই কমিটির মাধ্যমে সুবিধা নেওয়া ঋণগ্রহীতারাও নতুন সুবিধা নিতে পারবেন।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, ১ হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণস্থিতির ক্ষেত্রে আগে সুবিধা পাওয়া ঋণগ্রহীতাদের নতুন কাঠামোর অধীনে বিশেষ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের সুবিধা দেওয়া যাবে। এমনকি আগের গ্রেস পিরিয়ডের অতিবাহিত সময়কে নতুন গ্রেস পিরিয়ডের মধ্যে গণনা করে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত মেয়াদও বাড়ানো যেতে পারে।
এর অর্থ, কোনো বড় ঋণগ্রহীতা আগে ১০ বছর বা ১২ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা নিয়ে থাকলেও, নতুন শর্ত পূরণ করলে সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত মেয়াদ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে আগে নেওয়া পুনঃতফসিল সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আবার দীর্ঘমেয়াদি ঋণপরিশোধ কাঠামোয় যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন বড় ঋণগ্রহীতারা।
তবে ১ হাজার কোটি টাকার কম ঋণের ক্ষেত্রে নতুন করে ১৫ বছরের সুবিধা প্রযোজ্য হবে না। এসব ঋণগ্রহীতার জন্য বিশেষ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের সংশ্লিষ্ট সার্কুলারে নির্ধারিত মেয়াদই বহাল থাকবে।
নতুন নির্দেশনার সময়সীমাও নির্দিষ্ট করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগের নির্দেশনায় ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আবেদনের সুযোগ থাকলেও এবার তা বাড়িয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর করা হয়েছে। ফলে বড় ঋণগ্রহীতা ও ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের ঋণ হিসাব নতুন কাঠামোর আওতায় আনার জন্য আরও তিন মাস সময় দেওয়া হলো।
তবে আবেদন করলেই সুবিধা নিশ্চিত হবে না; প্রয়োজনীয় ডাউনপেমেন্ট গ্রহণসহ ব্যাংককে পুরো প্রক্রিয়া ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূলত ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ও আর্থিক কাঠামো পুনর্গঠনের বিষয়টি রয়েছে। অর্থনীতির দুর্বল সময়ে অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণের কিস্তি পরিশোধে চাপের মুখে পড়লে স্বল্প সময়ে পুরো অর্থ আদায়ের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ কাঠামো তৈরি করে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
তবে বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য মেয়াদ ১৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ব্যাংকিং খাতের জন্য যেমন স্বস্তির, তেমনি একটি বড় প্রশ্নও তৈরি করছে—দীর্ঘমেয়াদি পুনঃতফসিল কি প্রকৃতপক্ষে ব্যবসা পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি করবে, নাকি দুর্বল ঋণকে আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য টেনে নেওয়ার পথ তৈরি করবে?
কারণ ঋণের মেয়াদ বাড়লে তাৎক্ষণিক কিস্তির চাপ কমে। এতে প্রকৃতপক্ষে সক্ষম কোনো প্রতিষ্ঠান ঘুরে দাঁড়ানোর সময় পেতে পারে। কিন্তু ব্যবসার মৌলিক সক্ষমতা না থাকলে শুধু সময় বাড়িয়ে ঋণের প্রকৃত ঝুঁকি দূর করা যায় না। ফলে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি ঋণগ্রহীতার ব্যবসা, নগদ প্রবাহ, সম্পদ ও ভবিষ্যৎ পরিশোধ সক্ষমতা কতটা যাচাই করা হচ্ছে—সেটিই হবে এই নীতির কার্যকারিতার বড় পরীক্ষা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, এতে সক্ষম কিন্তু সাময়িকভাবে সমস্যায় পড়া প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় কার্যক্রমে ফিরতে পারবে এবং ব্যাংকগুলোও দীর্ঘ মেয়াদে ঋণের অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবে।
আরেকটি বিষয় হলো, আগে বিশেষ সুবিধা নেওয়া বড় ঋণগ্রহীতাদেরও পুনরায় দীর্ঘমেয়াদি সুবিধার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে পুরোনো ঋণ পুনঃতফসিলের একটি নতুন চক্র তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও নজরদারির বিষয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অবশ্য আগের নির্দেশনাগুলো অপরিবর্তিত রাখার কথা জানিয়েছে এবং নতুন সুবিধা নির্দিষ্ট শর্তের অধীনেই প্রযোজ্য হবে।
সব মিলিয়ে নতুন সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক বার্তা স্পষ্ট—বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য সময় বাড়ানো হচ্ছে, কিন্তু ঋণ মাফ করা হচ্ছে না। ১ হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বোচ্চ ১৫ বছরের পুনঃতফসিলের সুযোগ পাবে, যার মধ্যে সর্বোচ্চ দুই বছর গ্রেস পিরিয়ড থাকতে পারে।
এখন ব্যাংকগুলোর সামনে চ্যালেঞ্জ হলো, এই অতিরিক্ত সময়কে সত্যিকারের ব্যবসা পুনরুদ্ধার ও ঋণ আদায়ের সুযোগে পরিণত করা—যাতে পুনঃতফসিলের নামে সমস্যাগ্রস্ত ঋণ শুধু ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে না যায়।












