ঘরে বসে কয়েক ঘণ্টাতেই কোম্পানি নিবন্ধন, আসছে নতুন ব্যবস্থা

DSJ Web Photo BusinessRegistration
ছবি: বাণিজ্য মন্ত্রনালয়

কোম্পানি খুলতে গিয়ে দিনের পর দিন কাগজপত্র নিয়ে দপ্তরে ঘোরার চিত্র বদলে দিতে চাইছে সরকার। নতুন ব্যবস্থায় উদ্যোক্তার আবেদন থেকে পরিচয় যাচাই, নামের ছাড়পত্র এবং নিবন্ধন—পুরো প্রক্রিয়াই চলে যাবে অনলাইনে। এমনকি প্রাথমিক পর্যায়ে কর্মকর্তাদের দ্রুত যাচাই শেষে আবেদন জমা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কোম্পানি নিবন্ধন সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়েছে যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজেএসসি)।

সিঙ্গাপুরের দ্রুত ব্যবসা নিবন্ধন ব্যবস্থার আদলে আরজেএসসির এই রূপান্তরের কেন্দ্রে থাকছে ইলেকট্রনিক বিজনেস রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (ইবিআরএস)। ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হলে কোম্পানি নিবন্ধনের জন্য উদ্যোক্তাদের আর আরজেএসসি কার্যালয়ে গিয়ে আবেদন, কাগজ জমা বা বিভিন্ন ধাপের খোঁজ নিতে হবে না। ঘরে বসেই অনলাইনে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার সুযোগ মিলবে।

সোমবার (৩১ আগস্ট) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আরজেএসসির কার্যক্রম আধুনিকায়নসংক্রান্ত সভায় নতুন ব্যবস্থার অগ্রগতি তুলে ধরা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, উদ্যোক্তাদের আর আরজেএসসি কার্যালয়ে যেতে হবে না। স্বল্প সময়ে ঘরে বসেই কোম্পানি নিবন্ধনের সুযোগ দিতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আবেদনেই হবে পরিচয় যাচাই

নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসছে তথ্য যাচাইয়ে। উদ্যোক্তা অনলাইনে আবেদন করার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র, ই-টিন ও মোবাইল নম্বরের তথ্য রিয়েল-টাইমে প্রাক-যাচাই করার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।

এর ফলে আবেদনকারীর পরিচয়, করসংক্রান্ত তথ্য এবং মোবাইল নম্বরের তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করতে কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরতা কমবে। আবেদনে ভুল, অসংগতি কিংবা সন্দেহজনক তথ্য থাকলে তা দ্রুত শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।

এতে একদিকে সময় কমবে, অন্যদিকে একই তথ্য বারবার কাগজে জমা দেওয়ার প্রয়োজনও কমে আসবে। জালিয়াতি প্রতিরোধেও স্বয়ংক্রিয় যাচাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে সরকার।

তিন ধরনের দলিল, উদ্যোক্তার জন্য বাড়ছে পছন্দ

কোম্পানি গঠনের আইনি দলিল তৈরির ক্ষেত্রেও প্রক্রিয়াটি সহজ করা হচ্ছে। সংঘস্মারক ও সংঘবিধি তৈরির ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের জন্য তিনটি বিকল্প রাখা হচ্ছে।

প্রথমটি মানসম্মত নমুনা সংঘস্মারক ও সংঘবিধি। দ্বিতীয়টি ব্যবসার ধরন ও প্রয়োজন অনুযায়ী নিজস্ব ধারা যুক্ত করার সুযোগসহ পরিবর্তনযোগ্য সংঘস্মারক ও সংঘবিধি। তৃতীয়টি হলো আগে থেকেই অনুমোদিত পূর্বানুমোদিত সংঘস্মারক ও সংঘবিধি।

বিশেষ করে নমুনা ও পূর্বানুমোদিত দলিল ব্যবহার করলে কর্মকর্তাদের যাচাই ও অনুমোদনের সময় কমবে। ফলে যেসব কোম্পানি প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে নিবন্ধিত হবে, তাদের ক্ষেত্রে দ্রুত সেবা দেওয়ার সুযোগ আরও বাড়বে।

সরকারি তথ্যভান্ডারের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ

ইবিআরএসকে শুধু অনলাইন আবেদন নেওয়ার সফটওয়্যার হিসেবে রাখা হচ্ছে না। আবেদনকারীর তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করতে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করা হচ্ছে।

ভোটার ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য যাচাইয়ের জন্য নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে, মোবাইল সিমের তথ্য যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের সঙ্গে এবং তথ্যের নিরাপত্তা ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ডাটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

এর ফলে ভবিষ্যতে একটি কোম্পানি নিবন্ধনের আবেদন বিভিন্ন দপ্তরে আলাদা করে যাচাইয়ের বদলে একই ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করতে পারবে।

প্রথম ছয় মাসেই কয়েক ঘণ্টায় নিবন্ধনের লক্ষ্য

তবে পুরো ব্যবস্থা একদিনে শতভাগ স্বয়ংক্রিয় হচ্ছে না। বিশেষ করে স্বয়ংক্রিয় নাম ছাড়পত্র ব্যবস্থাকে আরও নির্ভুল করতে পেছনের অ্যালগরিদম উন্নয়নের কাজ চলছে।

এই কারণে ইবিআরএস পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় হওয়ার আগের সময়টিতে উদ্যোক্তাদের অপেক্ষায় না রেখে একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাস আবেদন জমা পড়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দ্রুত নামের ছাড়পত্র পুনঃযাচাই করবেন।

আবেদনের তথ্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিক থাকলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নিবন্ধন প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে এই সময়ে নমুনা ও পূর্বানুমোদিত সংঘস্মারক-সংঘবিধি ব্যবহারে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা হবে। পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় নাম ছাড়পত্র ব্যবস্থার অ্যালগরিদমও আরও উন্নত করা হবে।

২০২৭ সালের জানুয়ারিতে হস্তান্তরের লক্ষ্য

ইবিআরএসের চূড়ান্ত রূপান্তর ও হস্তান্তরের জন্যও সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রশাসনিক অনুমোদন অনুযায়ী সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ডাইনামিক সলিউশন লিমিটেডকে ১৫ জানুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে সফটওয়্যারটির চূড়ান্ত রূপান্তর ও হস্তান্তর সম্পন্ন করতে হবে।

এর আগে নিবন্ধন মডিউলের ব্যবহারকারী গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষা ইতোমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে পাওয়া মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

ইবিআরএসের কারিগরি নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। সফটওয়্যার উন্নয়নের বিভিন্ন পর্যায় পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি তারা কারিগরি দিকনির্দেশনাও দিচ্ছেন।

ব্যবসা শুরুর সময় কমানোর লক্ষ্য

আরজেএসসির এই রূপান্তরের তাৎপর্য শুধু একটি সরকারি দপ্তরের ডিজিটালাইজেশনে সীমাবদ্ধ নয়। কোম্পানি নিবন্ধনের সময় কমলে উদ্যোক্তার ব্যবসা শুরু করার সময়ও কমবে। একই সঙ্গে দপ্তরে সরাসরি উপস্থিতির প্রয়োজন কমায় যাতায়াত ও আনুষঙ্গিক ব্যয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

নতুন উদ্যোক্তা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং নতুন ব্যবসা উদ্যোগের ক্ষেত্রে এই সময় সাশ্রয় আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যবসা শুরুর আগে নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সময় লাগলে উদ্যোক্তার আর্থিক ব্যয় যেমন বাড়ে, তেমনি বিনিয়োগ ও কার্যক্রম শুরুর সময়ও পিছিয়ে যায়।

তবে পুরো ব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করবে শুধু সফটওয়্যার চালু হওয়ার ওপর নয়। সরকারি তথ্যভান্ডারের সঙ্গে সংযোগ কতটা নিরবচ্ছিন্ন থাকে, স্বয়ংক্রিয় যাচাই কতটা নির্ভুল হয় এবং কর্মকর্তাদের যাচাই-নির্ভর ধাপ কত দ্রুত কমানো যায়—তার ওপরই বাস্তব সেবার গতি নির্ভর করবে।

সরকারের লক্ষ্য তাই শুধু অনলাইনে আবেদন নেওয়া নয়; কোম্পানি নিবন্ধনের পুরো প্রক্রিয়াকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যেখানে একজন উদ্যোক্তার ব্যবসা শুরু করার পথে সরকারি নিবন্ধন আর দীর্ঘসূত্রতার কারণ না হয়।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top