মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অভিঘাত এবারও বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আগস্টে দেশে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ রেমিট্যান্স এলেও টানা তৃতীয় মাসে তা এই সীমা অতিক্রম করতে পারেনি। অথচ একই সময়ে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ধরে রাখতে আমদানি ব্যয়, রপ্তানি আয় ও বিদেশি ঋণ পরিশোধ—তিন দিক থেকেই চাপ রয়েছে। ফলে প্রবাসী আয় বাড়লেও অর্থনীতির জন্য এর প্রত্যাশিত স্বস্তি এখনো পুরোপুরি মিলছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্টে প্রবাসীরা দেশে ২৯৬ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। গত বছরের একই মাসের তুলনায় এই প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ২২ শতাংশ। আর জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
তবে প্রবৃদ্ধির এই চিত্রের পাশাপাশি উদ্বেগের জায়গাটিও স্পষ্ট। জুলাই, আগস্টসহ টানা তিন মাস দেশে প্রবাসী আয় ৩ বিলিয়ন ডলারের নিচে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কারণে ওই অঞ্চলে কর্মরত বাংলাদেশিদের আয় ও অর্থ পাঠানোর সক্ষমতায় চাপ তৈরি হওয়ায় মাসভিত্তিক প্রবাহ প্রত্যাশার তুলনায় কম থাকছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রবাসী আয়ের প্রবাহকে কোনোভাবেই খারাপ বলা যাচ্ছে না। বরং গত বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি এবং আগের মাসের তুলনায় বৃদ্ধি—দুটিই ইতিবাচক। কিন্তু বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির তুলনায় মাসে ৩ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি রেমিট্যান্স এখনো পর্যাপ্ত নয়।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমবাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হওয়ায় সেখানে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। যুদ্ধের কারণে কর্মসংস্থান, আয়, চলাচল ও আর্থিক লেনদেনে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে এর প্রভাব সরাসরি দেশে পাঠানো অর্থের ওপর পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মে মাসের পর থেকেই প্রবাসী আয়ের প্রবাহ প্রত্যাশিত মাত্রার নিচে রয়েছে। ফলে আগস্টে প্রায় ২২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থাকলেও সামগ্রিক প্রবাহকে এখনো শক্তিশালী পুনরুদ্ধার হিসেবে দেখার সুযোগ কম।
ব্যাংকাররা বলছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রেমিট্যান্সের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। কারণ একদিকে রপ্তানি আয় দুর্বল হচ্ছে, অন্যদিকে আমদানি ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের চাপ। এই পরিস্থিতিতে প্রবাসী আয় বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়িয়ে দেশের বহিঃখাতের ওপর চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তাদের মতে, প্রবাসী আয় সরাসরি আমদানি বিল পরিশোধে সহায়তা করার পাশাপাশি বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি থাকলেও মাসভিত্তিক প্রবাহ যদি ৩ বিলিয়ন ডলারের নিচে আটকে থাকে, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান নিয়ে স্বস্তি পুরোপুরি ফিরে আসবে না।
আগস্টের পরিসংখ্যান তাই বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে স্বস্তি ও সতর্কতার বার্তা দিচ্ছে। স্বস্তি হলো—এক বছর আগের তুলনায় প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সতর্কতার জায়গা হলো—প্রবাহ এখনো প্রত্যাশিত উচ্চতায় পৌঁছায়নি এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি সামনে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, রপ্তানি ও বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর চাপের সময়ে প্রবাসী আয়ই অর্থনীতির অন্যতম নির্ভরযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার উৎস। তাই এই প্রবাহ ধরে রাখা শুধু রেমিট্যান্স খাতের বিষয় নয়; বরং আমদানি, ঋণ পরিশোধ এবং সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।













