পোশাকের সঙ্গে পাট-ওষুধেও রপ্তানির গতি , প্রবৃদ্ধি ১৩%

Web Photo Card May 03 2026 EPBData
ছবি: ডিএসজে

বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা ও বাণিজ্যিক চাপের মধ্যেও নতুন অর্থবছরের দ্বিতীয় মাসে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে জোরালো গতি দেখা দিয়েছে। আগস্টে রপ্তানি আয় এক বছরের ব্যবধানে ১৩ শতাংশের বেশি বেড়ে ৪৪২ কোটি ৯৫ লাখ ডলারে উঠেছে।

শুধু পোশাক নয়, পাট, ওষুধ, চামড়া, প্রকৌশল পণ্য ও জুতার মতো কয়েকটি খাতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি এসেছে। তবে মাসভিত্তিক হিসাবে জুলাইয়ের তুলনায় রপ্তানি কমেছে ৬.৩০ শতাংশ—অর্থাৎ বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি রপ্তানিতে ওঠানামার চিত্রও স্পষ্ট।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট দুই মাসে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৯১৫ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আয় হয়েছিল ৮৬৮ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। ফলে দুই মাসে রপ্তানি বেড়েছে ৫.৪৩ শতাংশ বা প্রায় ৪৭ কোটি ১৩ লাখ ডলার।

আগস্টের প্রবৃদ্ধিই মূলত দুই মাসের মোট রপ্তানি প্রবৃদ্ধিকে টেনে ওপরে তুলেছে। আগস্টে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৪২ কোটি ৯৫ লাখ ডলার, যা ২০২৫ সালের আগস্টের ৩৯১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের চেয়ে ১৩.১৪ শতাংশ বেশি। তবে জুলাইয়ে রপ্তানি আয় ছিল ৪৭২ কোটি ৭৫ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে আগস্টে রপ্তানি কমেছে প্রায় ২৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার বা ৬.৩০ শতাংশ।

রপ্তানি প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে তৈরি পোশাক খাতই এগিয়ে রয়েছে। আগস্টে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৬০ কোটি ৮৯ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের ৩১৬ কোটি ৮ লাখ ডলারের তুলনায় ১৩.৯২ শতাংশ বেশি। জুলাই-আগস্টে এ খাত থেকে মোট আয় হয়েছে ৭৪৯ কোটি ৫৬ লাখ ডলার, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৭১৩ কোটি ৭ লাখ ডলার। অর্থাৎ দুই মাসে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৫.১২ শতাংশ।

পোশাকের দুই প্রধান উপখাতেই আগস্টে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি হয়েছে। নিট পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১৪.৮৮ শতাংশ। মাসটিতে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ২০৩ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। একই সময়ে ওভেন পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১২.৭০ শতাংশ, আয় হয়েছে ১৫৭ কোটি ৪২ লাখ ডলার। জুলাই-আগস্টে নিট পোশাকের প্রবৃদ্ধি ৬.১৭ শতাংশ এবং ওভেন পোশাকের ৩.৮১ শতাংশ।

তবে আগস্টের রপ্তানি পরিসংখ্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু পোশাকের প্রবৃদ্ধি নয়; পোশাকের বাইরে কয়েকটি খাতের দ্রুত সম্প্রসারণও। পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৩৭.০৯ শতাংশ। আগস্টে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ৭ কোটি ৭২ লাখ ডলার। দুই মাসে আয় দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটি ২৫ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৭.০৯ শতাংশ বেশি।

ওষুধ রপ্তানিতেও শক্তিশালী গতি দেখা গেছে। আগস্টে এ খাতের আয় ৩৮.৯৪ শতাংশ বেড়ে ২ কোটি ৪২ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। জুলাই-আগস্টে ওষুধ রপ্তানি বেড়েছে ২৮.৫২ শতাংশ, আয় হয়েছে ৪ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যেও আগস্টে ২৪.৮৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। দুই মাসে এ খাতের রপ্তানি বেড়েছে ১২.৫৮ শতাংশ।

প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানিও আগস্টে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ খাতে মাসিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০.৪৬ শতাংশ। জুলাই-আগস্টে প্রকৌশল পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ২৩.৮৮ শতাংশ। দুই মাসে আয় হয়েছে ১২ কোটি ৯৮ লাখ ডলার। একই সময়ে অন্যান্য জুতা রপ্তানি বেড়েছে ২৭.৩২ শতাংশ এবং দুই মাসে আয় হয়েছে ১০ কোটি ৭৪ লাখ ডলার।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য খাত হলো মুদ্রিত সামগ্রী। আগস্টে এ খাতের রপ্তানি ৪১.৪৯ শতাংশ এবং জুলাই-আগস্টে ২৮.৪৩ শতাংশ বেড়েছে। দুই মাসে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ২ কোটি ৬২ লাখ ডলার। বিশেষায়িত বস্ত্র রপ্তানিও দুই মাসে ১১.৩০ শতাংশ বেড়েছে। গৃহসজ্জার বস্ত্রের রপ্তানি বেড়েছে ১১.১৭ শতাংশ।

পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর এই প্রবণতার বিপরীতে কিছু খাতে বড় পতনও রয়েছে। প্রাথমিক পণ্য রপ্তানি জুলাই-আগস্টে ৯.১৯ শতাংশ কমেছে। মাছ ও চিংড়ির রপ্তানিতে দুর্বলতা এর অন্যতম কারণ। দুই মাসে চিংড়ি রপ্তানি কমেছে ২০.৪৬ শতাংশ। কৃষিপণ্য রপ্তানিও কমেছে ৯.১০ শতাংশ। বিশেষ করে তামাক, ফল ও তেলবীজের রপ্তানিতে বড় পতন হয়েছে।

রপ্তানির বাজারেও পরিবর্তনের কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার হিসেবে আগস্টে ২৬.০৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। জুলাই-আগস্টে দেশটিতে রপ্তানি বেড়েছে ১১.৯০ শতাংশ। যুক্তরাজ্য দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজারের অবস্থান পুনরুদ্ধার করেছে। এরপর রয়েছে জার্মানি, স্পেন ও নেদারল্যান্ডস।

উদীয়মান বাজারগুলোর মধ্যে তুরস্কে রপ্তানি সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে। আগস্টে দেশটিতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪১.০৩ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়ায় বেড়েছে ৪২.৩৭ শতাংশ এবং সৌদি আরবে ৪২.০৯ শতাংশ। এসব বাজারে প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের প্রচলিত রপ্তানি বাজারের বাইরে নতুন চাহিদা তৈরির সম্ভাবনাকে সামনে আনছে।

ইপিবির মতে, প্রধান বাজারগুলোতে চাহিদা বাড়া, বাংলাদেশকে নির্ভরযোগ্য সোর্সিং গন্তব্য হিসেবে ক্রেতাদের আস্থা বৃদ্ধি, উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণ, অধিক মূল্য সংযোজিত পণ্যের রপ্তানি এবং পণ্য ও বাজার বৈচিত্র্যকরণের প্রচেষ্টাই সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন করেছে।

তবে পরিসংখ্যানটি একই সঙ্গে সতর্ক হওয়ার কারণও দেখাচ্ছে। আগস্টে বছরওয়ারি ১৩.১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও জুলাইয়ের তুলনায় রপ্তানি ৬.৩০ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা বাড়লেও প্রবৃদ্ধি এখনো ধারাবাহিক ও সমান গতির নয়। তাছাড়া মোট রপ্তানির বড় অংশ এখনো তৈরি পোশাকনির্ভর। জুলাই-আগস্টে মোট ৯১৫ কোটি ৬৯ লাখ ডলারের রপ্তানির মধ্যে পোশাক থেকেই এসেছে ৭৪৯ কোটি ৫৬ লাখ ডলার—অর্থাৎ মোট রপ্তানির প্রায় ৮২ শতাংশ।

ফলে সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো পোশাকের পাশাপাশি কিছু অপ্রচলিত খাতের গতি বাড়া। পাট, ওষুধ, চামড়া, প্রকৌশল পণ্য, জুতা ও বিশেষায়িত বস্ত্রের মতো খাতে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে সেই বৈচিত্র্যকে বড় আকারে নিতে হলে শুধু রপ্তানি আদেশ বাড়ানো নয়, উৎপাদন সক্ষমতা, মান, মূল্য সংযোজন এবং নতুন বাজারে স্থায়ী উপস্থিতি—সবকিছুর ওপরই নজর দিতে হবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

More News

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top