মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার মধ্যে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়েছে বিশ্বের ১০টি শীর্ষ বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক (এমডিবি)। ১৭ এপ্রিল ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ বসন্তকালীন সম্মেলনের সাইডলাইনে আয়োজিত এক বৈঠকে ব্যাংক প্রধানরা এই ঘোষণা দেন।
বৈঠকে ব্যাংক প্রধানরা স্বীকার করেছেন যে, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান মূল্য এবং সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হওয়ায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতিতে ইতিমধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এমডিবিগুলো সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সংকটে থাকা দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষায় কার্যকর সহায়তা দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে।
এই শীর্ষ সম্মেলনে বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে একটি যুগান্তকারী ঐকমত্যে পৌঁছেছেন ১০ ব্যাংকের প্রধানরা। তারা বেসরকারি পুঁজিকে বড় বড় প্রকল্পে আকৃষ্ট করার জন্য ‘অরিজিনেট-টু-ডিস্ট্রিবিউট’ পদ্ধতির প্রসারে একটি বিশেষ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো অবকাঠামো উন্নয়নে বেসরকারি বিনিয়োগকেও কাজে লাগাতে পারবে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রেসিডেন্ট এবং এমডিবি প্রধানদের গ্রুপের বর্তমান চেয়ারম্যান মাসাতো কান্দা এই বৈঠকের মূল সুর বেঁধে দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, বর্তমানের জটিল বৈশ্বিক পরিবেশে উন্নয়ন ব্যাংকগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি নিবিড়ভাবে কাজ করছে। তারা দেশগুলোকে তাৎক্ষণিক চাপ সামলানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে টেকসই হওয়ার সক্ষমতা তৈরিতে সহায়তা করবে।
বৈঠকের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত দিক ছিল উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন বৃদ্ধি করা। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, কারণ এটি আন্তর্জাতিক বাজারে ডলার সংকটের সময় বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে বিনিময় হারের ঝুঁকি কমাতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে। স্থানীয় মুদ্রায়ও ঋণ দেবে উন্নয়ন সংস্থাগুলো—এই উদ্যোগটি মূলত ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতেই নেওয়া হয়েছে।
সাধারণত এমডিবিগুলো যখন ডলারে ঋণ দেয়, তখন ডলারের দাম বেড়ে গেলে বাংলাদেশকে ঋণের কিস্তি পরিশোধে বাড়তি টাকা গুনতে হয়। কিন্তু স্থানীয় মুদ্রায় বা টাকায় অর্থায়ন করা হলে ঋণের অঙ্কটি শুরুতেই টাকায় নির্ধারিত হয়ে যায়। ফলে ভবিষ্যতে ডলারের মান বাড়লেও বাংলাদেশের ঋণের দায় টাকার অঙ্কে অপরিবর্তিত থাকে। এটিই মূলত স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়নের সবচেয়ে বড় সুবিধা।
এই প্রক্রিয়ায় ঋণ পরিশোধের বিষয়টিও বাংলাদেশের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। এমডিবিগুলো যদি স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ দেয়, তবে অনেক ক্ষেত্রে তারা সেই মুদ্রাতেই ঋণ পরিশোধের সুযোগ রাখে। বিশেষ করে যদি কোনো এমডিবি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ‘বন্ড’ ছেড়ে টাকা সংগ্রহ করে থাকে, তবে কিস্তি সরাসরি টাকায় পরিশোধ করা যাবে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর কোনো চাপ পড়ে না।
রিজার্ভ সংকটের এই সময়ে এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় স্বস্তি। এছাড়া অফশোর বন্ড বা কারেন্সি সোয়াপের মাধ্যমেও এই প্রক্রিয়া সচল রাখা সম্ভব। অনেক সময় এই ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে ‘টাকা-ডিনোমিনেটেড বন্ড’ বা ‘বাংলা বন্ড’ ছাড়ে। এক্ষেত্রে তারা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ডলার নিলেও ঋণের হিসাব রাখে টাকায়। বাংলাদেশ যখন কিস্তি দেয়, তখন তারা সমপরিমাণ টাকা দেয় যা ডলারে কনভার্ট হয়ে যায়।
তবে স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়নের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এই ঋণের সুদের হার সাধারণত ডলারের ঋণের চেয়ে কিছুটা বেশি হতে পারে। কারণ এমডিবিগুলো টাকার মান কমে যাওয়ার ঝুঁকি বা মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা বিবেচনা করে সুদের হার কিছুটা সমন্বয় করে নেয়। তবুও দীর্ঘমেয়াদে ডলারের অস্থিতিশীলতা বিবেচনা করলে এটি বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য অনেক বেশি নিরাপদ ও সাশ্রয়ী।
এই নতুন অর্থায়ন মডেলের পাশাপাশি উদীয়মান বাজারগুলোতে ঋণের ঝুঁকি কমাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে গ্লোবাল ইমার্জিং মার্কেটস (জিইএম) কনসোর্টিয়ামকে শক্তিশালী করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘ক্রিটিক্যাল মিনারেলস’ সরবরাহ চেইনকে বৈচিত্র্যময় ও টেকসই করতে ব্যাংকগুলো একে অপরকে সহযোগিতা করার অঙ্গীকার করেছে। এতে খনিজ সম্পদের ওপর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অধিকার আরও সুসংহত হবে।
এর পাশাপাশি ‘ওয়াটার ফরোয়ার্ড’ নামে একটি বৈশ্বিক উদ্যোগের সূচনা করা হয়েছে, যা পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনশীলতা ও খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে অর্থায়ন করবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর মতো আধুনিক প্রযুক্তির সম্ভাবনাকেও উন্নয়নের হাতিয়ার করার অঙ্গীকার করা হয়েছে বৈঠকে। এতে সদস্য দেশগুলোর ডিজিটাল রূপান্তরের পথ আরও প্রশস্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উন্নয়ন ব্যাংকগুলো নিজেদের কাজের কার্যকারিতা বাড়াতে একটি ‘সমন্বিত সিস্টেম’ হিসেবে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছে। বিশেষ করে প্রকল্পের প্রকিউরমেন্ট বা কেনাকাটার ক্ষেত্রে ‘ভ্যালু ফর মানি’ ফ্রেমওয়ার্ক অনুসরণ করা হবে যাতে অপচয় রোধ করা যায়। এটি প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় কমাতে সাহায্য করবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বৈঠকের ফলাফল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কারণ বাংলাদেশের মেগা প্রজেক্ট এবং জ্বালানি খাতে এই ১০টি ব্যাংকের অধিকাংশেরই বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটে যখন জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়ছে, তখন এমডিবি প্রধানদের এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান বাংলাদেশের জন্য একটি সুরক্ষাকবচ হতে পারে। এই সমন্বিত উদ্যোগ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কিছুটা হলেও লাঘব করবে।
বিশেষ করে স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের নতুন সুযোগগুলো বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারে। বৈঠকে অংশগ্রহণকারী বিশ্বব্যাংক, এডিবি ছাড়াও এআইআইবি, আইডিবি এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী। আইএমএফ-ও এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহণ করেছে, যা ঋণ কাঠামোর একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।













