ইউনুস সরকারের চুক্তি কি তবে জ্বালানি পরাধীনতার দলিল?

DSJ Web Photo April 18 2026 DebapriyaBhattacharya
ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিগত ইউনুস সরকারের সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সার্বভৌমত্বকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি মনে করেন, এই চুক্তির ফলে কার কাছ থেকে জ্বালানি কেনা হবে, সেই সিদ্ধান্তের জন্য অন্য কোনো শক্তির মুখাপেক্ষী হওয়া একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য চরম অবমাননাকর।

জাতীয় নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে সই হওয়া এই চুক্তির আইনি ও কৌশলগত বাধ্যবাধকতাগুলো দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে বলে তিনি দাবি করেন।

আজ শনিবার এফডিসিতে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি আয়োজিত প্রাক্‌-বাজেট আলোচনা ও ছায়া সংসদে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. দেবপ্রিয় এই পর্যবেক্ষণগুলো তুলে ধরেন। তিনি বর্তমান সরকারের নীতিগত বৈপরীত্যের সমালোচনা করে বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশভিত্তিক একক কোনো বৈদেশিক নীতি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু রাশিয়ার বদলে যুক্তরাষ্ট্রের বলয়ভুক্ত জ্বালানি নীতি গ্রহণ করায় সেই নিরপেক্ষ অবস্থানের লেশমাত্র অবশিষ্ট নেই। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে সম্পাদিত এই চুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি আমদানির উৎস নির্ধারণের ক্ষমতা কার্যত বিদেশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

ড. দেবপ্রিয় প্রশ্ন তোলেন, যদি তেল আমদানির ক্ষেত্রে অন্য কোনো পরাশক্তির অনুমতির প্রয়োজন হয়, তবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে? রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে যে এক মাসের বিশেষ ছাড়ের সুযোগ তৈরি হয়েছিল, সরকার সেই সুযোগটি কেন সময়মতো কাজে লাগাতে পারল না, তা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর মতে, কৌশলগত এই ব্যর্থতা দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

জ্বালানি ও ব্যাংক খাতকে অর্থনীতির ‘দুই ফুসফুস’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন যে, এই দুই খাতের বিশৃঙ্খলা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে অচল করে দিতে পারে।

দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উত্তোলনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে অবহেলা করার দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি এখনো বহাল থাকায় তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলের চাপে আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। নিজস্ব খনি থেকে গ্যাস উত্তোলনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না করে বিদেশ থেকে চড়া মূল্যে এলএনজি আমদানির যে প্রবণতা শুরু হয়েছিল, ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলেও বহাল ছিল। এখন এই পরনির্ভরশীলতা বাংলাদেশকে একটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি চক্রের মধ্যে বন্দি করে ফেলেছে।

সংস্কার প্রসঙ্গে এই প্রবীণ অর্থনীতিবিদ বর্তমান সরকারকে কঠোরভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করান। তিনি গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অর্থনীতি নিয়ে যেসব তথ্যসমৃদ্ধ শ্বেতপত্র এবং সংস্কারের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছিল, সেগুলো কি এখন কেবল জাদুঘরে সাজিয়ে রাখার বস্তু? কেন নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এখনো বিভিন্ন খাতের সংস্কার কমিশনগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে গঠন করা হলো না, সেই প্রশ্নও তিনি জনসাধারণের পক্ষ থেকে রেখেছেন। তিনি মনে করেন, সরকারের বর্তমান সংকেতগুলো অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে না।

অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি জ্বালানি খাতের সংকট নিরসনে গঠিত ক্যাবিনেট সাব-কমিটির কার্যকারিতা জানতে চান। ড. দেবপ্রিয়র মতে, এই কমিটি কতবার বৈঠক করেছে বা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা জনগণের সামনে স্পষ্ট নয়। যদি ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ যানবাহনের সারি কমানো না যায় এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হয়, তবে এই ধরণের কমিটির অস্তিত্বের কোনো সার্থকতা থাকে না।

আইএমএফের কিস্তি ছাড় না হওয়ার বিষয়টিও সরকারের সংস্কার প্রচেষ্টার ব্যর্থতা হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন। সরকারের বিভিন্ন ধরণের কার্ড—যেমন ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ড—বিতরণের পরিকল্পনাকে তিনি বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অবাস্তব ও উচ্চাভিলাষী বলে মন্তব্য করেন। তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দীর্ঘ লম্ফ দেওয়ার আগে যেমন কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে গতি সঞ্চয় করতে হয়, ঠিক তেমনি অর্থনীতির ভঙ্গুর দশা কাটাতে এখন কিছু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় সংকোচন করা জরুরি। আগামী পাঁচ বছরের রোডম্যাপ এবারের বাজেটেই থাকা অত্যাবশ্যক, অন্যথায় দেশ গভীরতর সংকটে নিমজ্জিত হবে।

বাজেট প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, দরিদ্র মানুষের করের টাকায় ধনীদের পকেট ভারী করার মতো ভর্তুকি ব্যবস্থা অবিলম্বে সংস্কার করতে হবে। একই সঙ্গে দেশীয় খনি থেকে জ্বালানি ও গ্যাস আবিষ্কারে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে সরাসরি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট দেশের বলয়ে আবদ্ধ না থেকে বিকল্প ও সাশ্রয়ী উৎস খুঁজে বের করার ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন।

ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি আর আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার চাপে দেশ এক ভয়াবহ ক্রান্তিকাল পার করছে। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং আমদানি ব্যয় বাড়ায় সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এই চক্র থেকে মুক্তি পেতে হলে আগামী বাজেটে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং জনবান্ধব জ্বালানি নীতি গ্রহণ করতে হবে।

অনুষ্ঠানে ময়মনসিংহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতার্কিকরা স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশকে পরাজিত করে জ্বালানি নিরাপত্তা বিষয়ক ছায়া সংসদে বিজয়ী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। বিচারক হিসেবে উপস্থিত প্রথিতযশা সাংবাদিক ও বিশেষজ্ঞগণও এই বিতর্কে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে সহমত পোষণ করেন যে, জ্বালানি খাতের যেকোনো পরাধীনতা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতির জীবনীশক্তি কেড়ে নিতে পারে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top