তীব্র তারল্য সংকট, পর্ষদ পরিবর্তনজনিত গ্রাহক বিক্ষোভ এবং জাতীয় সংসদে তুমুল রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-তে নতুন পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আশরাফুল আলমকে গতকাল বুধবার (১০ জুন) জরুরি ভিত্তিতে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৯(১)(ঘ)(আ) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত বিশেষ ক্ষমতাবলে তাকে এই নিয়োগ দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক সার্বিক কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ, ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ সংরক্ষণ, সাধারণ আমানতকারীদের আমানতের নিরাপত্তা এবং বৃহত্তর জনস্বার্থ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নবনিযুক্ত পর্যবেক্ষক মোহাম্মদ আশরাফুল আলম এখন থেকে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সব ধরনের নীতি নির্ধারণী সভাসহ প্রাসঙ্গিক অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে সরাসরি অংশগ্রহণ করবেন। একই সাথে তিনি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ দৈনন্দিন কার্যক্রম ও আর্থিক লেনদেনের চিত্র নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখে সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রয়োজনীয় তথ্য ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রদান করবেন।
দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের চরম অস্থিরতার মধ্যে আর্থিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। পর্ষদ বদলের পর গত এক সপ্তাহে ব্যাংকটি থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত তুলে নেওয়ার পর এবং তারল্য সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধার চাওয়ার এই ক্রান্তিকালে এই নতুন পর্যবেক্ষক নিয়োগের পদক্ষেপটি ইসলামী ব্যাংকের হারিয়ে যাওয়া জনআস্থা ও অভ্যন্তরীণ আর্থিক শৃঙ্খলা পুনরায় সুদৃঢ় করতে বড় ধরনের সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে ইসলামী ব্যাংকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষক নিয়োগের এই ইতিহাস অতীতে খুব একটা সুখকর ছিল না। এর আগে বিগত ২০২৩ সালে যখন ব্যাংকটিতে এস আলম গ্রুপের নজিরবিহীন লুটপাট ও অর্থ পাচার চরম আকার ধারণ করেছিল, তখন এই ব্যাংকের পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বর্তমান গভর্নর কার্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক মো. সরোয়ার হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, তার উপস্থিতিতেই ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়কে তোয়াক্কা না করে হাজার হাজার কোটি টাকার ভুয়া ঋণ বের করে নেওয়া হয়েছিল, যা এস আলমের প্রাতিষ্ঠানিক ডাকাতিকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর, ব্যাংক লুটপাটে এস আলম গ্রুপকে সরাসরি পরোক্ষ সহযোগিতা ও দুর্নীতির ঢাল দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তৎকালীন বিতর্কিত পর্যবেক্ষক সরোয়ার হোসেনকে তলব করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ স্তরের কর্মকর্তাদের একাংশের এমন অপরাধমূলক অতীত অভিজ্ঞতার কারণে, নতুন পর্যবেক্ষক মোহাম্মদ আশরাফুল আলমের ওপর এবার ইসলামী ব্যাংকের ৫০ শতাংশ হয়ে যাওয়া খেলাপি ঋণ উদ্ধার ও ব্যাংকের প্রকৃত মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কড়া নজরদারি রাখার গুরুদায়িত্ব দেখছেন আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা।













