পুঁজিবাজারে আসতে চাইলে আর সব কোম্পানিকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যেতে হবে না। নির্দিষ্ট শ্রেণির কোম্পানির জন্য সরাসরি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তির পথ খুলে দিতে নতুন বিধিমালা আনছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
প্রস্তাবিত বিধিমালায় সরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানি, বড় টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা-আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বড় সম্পদ বা টার্নওভারসম্পন্ন কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ দেওয়ার কাঠামো রাখা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বিএসইসির ১০২৭তম কমিশন সভায় ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃক সরাসরি সিকিউরিটিজ তালিকাভুক্তি) বিধিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া অনুমোদনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কমিশন জানিয়েছে, খসড়াটি শিগগিরই জনমত যাচাইয়ের জন্য পত্রিকা ও কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় সরাসরি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের অন্তত ১০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ শেয়ার বাজারে ছাড়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ নতুন শেয়ার ইস্যু করে মূলধন সংগ্রহের বদলে বিদ্যমান মালিকদের হাতে থাকা শেয়ারের একটি অংশ বাজারে অফলোড করেও কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে পারবে।
বিএসইসির প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারের সম্পূর্ণ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন কোম্পানি সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য যোগ্য হবে। একইভাবে কোনো কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের কমপক্ষে ১০ শতাংশ সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মালিকানায় থাকলেও সেটি এ সুবিধার আওতায় আসতে পারবে।
বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানির ক্ষেত্রেও সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের সম্পূর্ণ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো প্রস্তাবিত বিধিমালার আওতায় এ সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হবে।
টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সরাসরি তালিকাভুক্তির তালিকায় রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন কমপক্ষে ৩০০ কোটি টাকা হতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানটিকে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন অনুমোদিত টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো অথবা উৎপাদন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে।
আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও থাকছে আলাদা সুযোগ। কমপক্ষে তিন বছর কার্যক্রম পরিচালনা করেছে—এমন তফসিলি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা কোম্পানি প্রস্তাবিত সরাসরি তালিকাভুক্তির কাঠামোর আওতায় আসতে পারবে।
এ ছাড়া বড় আকারের ব্যবসা পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলোকেও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। যেসব কোম্পানির বার্ষিক টার্নওভার অথবা মোট সম্পদের পরিমাণ কমপক্ষে ৫০০ কোটি টাকা, তারাও নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ পাবে। পুঁজিবাজারের অবকাঠামোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কমিশনে নিবন্ধিত স্টক এক্সচেঞ্জ, ডিপোজিটরি ও সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টিসহ নির্ধারিত অন্যান্য বাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানও এ কাঠামোর আওতায় আসতে পারে।
বিএসইসির এই উদ্যোগকে শুধু তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ করার পদক্ষেপ হিসেবে দেখলে এর বড় নীতিগত দিকটি বাদ পড়ে যায়। গতকাল সোমবার বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান জানিয়েছিলেন, নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আসা থেকে শুধু মালিকপক্ষের অনাগ্রহের কারণে বাইরে থাকার সুযোগ দিতে চায় না কমিশন।
সিকিউরিটিজ আইনের ২০-এর ‘এ’ ধারার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন, জনস্বার্থে প্রয়োজন হলে কোনো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আসার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা কমিশনের রয়েছে। এই ক্ষমতাকে কার্যকর কাঠামোর মধ্যে আনতে ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানি’ নিয়ে নতুন আইন বা বিধি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট শ্রেণির কোম্পানির জন্য পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির আবেদন বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
ফলে বিএসইসির সাম্প্রতিক দুটি উদ্যোগকে পাশাপাশি রাখলে পুঁজিবাজারে বড় কোম্পানি আনার একটি নতুন নীতিগত কাঠামোর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। একদিকে নির্দিষ্ট শ্রেণির কোম্পানির জন্য সরাসরি তালিকাভুক্তির পথ সহজ করা হচ্ছে, অন্যদিকে জনস্বার্থে প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট কোম্পানিকে বাজারে আসার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা প্রয়োগের কাঠামো তৈরির উদ্যোগ চলছে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের পুঁজিবাজারে ভালো ও বড় কোম্পানির ঘাটতি রয়েছে। বাজারে বিনিয়োগযোগ্য শেয়ারের সরবরাহ সীমিত হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের পছন্দের পরিসরও সংকুচিত। একই সঙ্গে বড় ও মৌলভিত্তি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত না হওয়ায় বাজারের গভীরতা ও বৈচিত্র্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিএসইসির নতুন সরাসরি তালিকাভুক্তি কাঠামোর লক্ষ্য এই ঘাটতি কাটিয়ে বাজারে নতুন ও বড় প্রতিষ্ঠান আনা।













