প্রস্তাবিত ‘মিয়ানমার-চীন করিডোর’: কী সুবিধা বাংলাদেশের

DSJ Web Photo June 28 2026 ChinaMyanmarCorridor
ছবি: বাসস

মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে প্রস্তাবিত ত্রিদেশীয় অর্থনৈতিক করিডোরটি চালু হলে সমুদ্রপথের দীর্ঘ ১৫ থেকে ২৫ দিনের দূরত্বের বিপরীতে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সড়কপথে সরাসরি চীনে পণ্য পরিবহন করতে পারবে বাংলাদেশ। মূলত যাতায়াতের সময় বাঁচানো এবং লজিস্টিকস ও পরিবহন খরচ এক ধাক্কায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে বিশ্ববাজারে দেশীয় পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে বেইজিংয়ের এই প্রস্তাবটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছে ঢাকা।

শনিবার (২৭ জুন) পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সংবাদ ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এই মেগা করিডোর নিয়ে সরকারের বাণিজ্যিক চিন্তাভাবনার বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই করিডোর থেকে বাংলাদেশের প্রধান অর্থনৈতিক প্রাপ্তি ও সুবিধার জায়গাটি স্পষ্ট করে বলেন, “সরকার করিডোর নিয়ে চীনের প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখছে। আমরা এখনো এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত অবস্থান নেইনি।”

ড. খলিলুর রহমান আরও যোগ করেন, “তবে আমাদের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই করিডোরের মাধ্যমে পরিবহন খরচ কমিয়ে আনা। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে পরিবহন ব্যয় ও সময় কমিয়ে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা।”

পররাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের অর্থনৈতিক জোনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে দ্রুত ও কম ব্যয়বহুল যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন অত্যন্ত প্রয়োজন। আমরা বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচকভাবে ভাবছি।”

বাণিজ্যিক ও কারিগরি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই করিডোরটি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের লজিস্টিকস খাতে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এর ভৌগোলিক ও কৌশলগত সুবিধা ব্যাখ্যা করে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।

খলিলুর রহমান বলেন, “বর্তমানে চীনের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে মিয়ানমারের বন্দরগুলোর সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। সেই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বাংলাদেশের সঙ্গে মাল্টিমোডাল (সড়ক, রেল ও নৌপথ) সংযোগ গড়ে তোলা সম্ভব হলে পরিবহন সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।”

তিনি বিশ্ববাজারের উদাহরণ দিয়ে বলেন, “পৃথিবীতে এ ধরনের ট্রান্সপোর্ট করিডোর রয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য দ্রুত ও কম খরচে যোগাযোগ নিশ্চিত করা। আমরা এই করিডোরের কারিগরি ও অর্থনৈতিক প্রভাবগুলো নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করছি।”

এই করিডোরের বড় বাণিজ্যিক সুবিধা হলো, এর মাধ্যমে লজিস্টিকস খরচ প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় করা সম্ভব। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বাস্তবায়নাধীন প্রায় ৮০০ একরের ‘বিশেষ চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল’ মূলত চিনা বিনিয়োগকারীদের জন্য সংরক্ষিত একটি বিশেষ শিল্পাঞ্চল, যা বাংলাদেশের মাটিতে সরাসরি চিনা বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং চিনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি’ যৌথভাবে এই মেগা পার্কটি উন্নয়ন ও পরিচালনা করছে।

প্রস্তাবিত মিয়ানমার-চীন করিডোরটি ব্যবহার করে চীনা কাঁচামাল অত্যন্ত দ্রুত ও সস্তায় দেশে এনে পণ্য তৈরি করা যাবে। পরবর্তীতে সেই উৎপাদিত পণ্য চীনের দেওয়া শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে সরাসরি চীনের মূল ভূখণ্ডে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে রপ্তানি করা যাবে।

এর ফলে একদিকে যেমন দেশের বড় বাণিজ্য ঘাটতি কমে আসবে, অন্যদিকে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নেপাল ও ভুটানের ট্রানজিট চার্জ বাবদ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয়ের প্রধান আঞ্চলিক হাবে পরিণত হতে পারবে।

চীন সফরের সামগ্রিক অর্জন, চুক্তি ও প্রাপ্তির বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে দৃঢ়তার সাথে বলেন, “গত বছরের তুলনায় এবারের সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পরিধি ও গভীরতা অনেক বেড়েছে। আমরা বেইজিংয়ে কোনো ভিক্ষার থালা নিয়ে যাইনি।”

তিনি প্রাপ্তির সমীকরণ স্পষ্ট করে বলেন, “এই সফর ছিল মূলত দুই দেশের সম্পর্কের আগামী দিনের দিকনির্দেশনা নির্ধারণের জন্য। যদি দিকনির্দেশনা সঠিকভাবে মেলানো যায়, তবে বাকি প্রাপ্তিগুলো ভবিষ্যতে এমনিতেই আসবে।”

৬ দিনের এই ঐতিহাসিক দ্বিপক্ষীয় সফরে দুই দেশের মধ্যে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং সম্পর্ককে চীনের বৈদেশিক সম্পর্কের সর্বোচ্চ স্তর ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন সম্প্রদায়’ গঠনে উন্নীত করা হয়েছে।

সংবাদ ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুমায়ুন কবির, বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম উপস্থিত ছিলেন।

কর্মকর্তারা জানান, রাজনৈতিক অংশীদারত্ব বাড়াতে দুই দেশের দলীয় পর্যায়েও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। একই সাথে দুই দেশ সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বন্যা প্রতিরোধ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং नदी খননসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রযুক্তি বিনিময়ে সম্মত হয়েছে।

বহুল আলোচিত তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে এবং দ্রুতই এর সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হবে। এছাড়া রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে চীন জানিয়েছে, তারা সংকট নিরসনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয় পক্ষের সঙ্গেই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top