স্বল্পমেয়াদি সুকুকে বিনিয়োগের এত আগ্রহ কেন?

Web Photo Card June 28 2026 SukukBond
প্রতীকী ছবি (AI দ্বারা তৈরি)

দেশের আর্থিক খাতে শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগের নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে প্রথম স্বল্পমেয়াদি সরকারি সুকুক। ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রথম নিলামেই জমা পড়েছে ৫৬ হাজার ৬০৭ কোটি টাকার আবেদন। অর্থাৎ, নয় মাস মেয়াদি এ সুকুকের নির্ধারিত ইস্যু আকারের বিপরীতে চাহিদা ছিল ১০ দশমিক ২৯ গুণ।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুল আগ্রহ কেবল একটি নতুন বিনিয়োগ পণ্যের প্রতি আগ্রহ নয়; বরং দেশের ইসলামি ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের তারল্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা দূর করার একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে স্বল্পমেয়াদি সুকুকের চাহিদার প্রতিফলন।

বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের সবচেয়ে বড় কারণ হলো, ইসলামি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগের অভাব। প্রচলিত ট্রেজারি বিল সুদভিত্তিক হওয়ায় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো সেখানে বিনিয়োগ করতে পারে না। ফলে উদ্বৃত্ত তারল্য ব্যবস্থাপনায় তাদের বিকল্প ছিল সীমিত।

নয় মাস বা ২৭৩ দিন মেয়াদি এ সুকুক সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে। এর মাধ্যমে ইসলামি ব্যাংকগুলো স্বল্প সময়ের জন্য উদ্বৃত্ত অর্থ নিরাপদে বিনিয়োগ করতে পারবে, একই সঙ্গে তারল্য ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর হবে।

আগ্রহ বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হলো এর প্রতিযোগিতামূলক মুনাফা। বার্ষিক ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ রেন্টাল রেট নির্ধারণ করায় এটি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রভিডেন্ট ফান্ড, মিউচুয়াল ফান্ড এবং ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের কাছেও আকর্ষণীয় বিনিয়োগের সুযোগ হয়ে উঠেছে।

এ ছাড়া সুকুকটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক সুবিধা। যোগ্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এটি স্ট্যাচুটরি লিকুইডিটি রিজার্ভ (এসএলআর) সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে। ফলে ব্যাংকগুলোর বাধ্যতামূলক তারল্য সংরক্ষণের শর্ত পূরণেও এটি ব্যবহার করা যাবে।

পাশাপাশি ইসলামি ব্যাংকগুলো প্রয়োজনে এ সুকুক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জামানত হিসেবে রেখে ইসলামিক ব্যাংকস লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি (আইবিএলএফ) থেকে তারল্য সহায়তা নিতে পারবে। ফলে এটি শুধু বিনিয়োগের মাধ্যম নয়, তারল্য সংকট মোকাবিলার কার্যকর হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করবে।

সহজভাবে বলতে গেলে, সুকুক হলো প্রচলিত সুদভিত্তিক বন্ডের শরিয়াহসম্মত বিকল্প। প্রচলিত বন্ডে বিনিয়োগকারীরা সুদ পান, কিন্তু সুকুকে নির্দিষ্ট কোনো সম্পদ বা প্রকল্প থেকে অর্জিত আয়ের অংশ বা ভাড়াভিত্তিক মুনাফা পান। এবারের সুকুকটি ইস্যু করা হয়েছে ‘ইম্পর্ট্যান্ট রুরাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট-২ (আইআরআইডিপি-২)’-এর বিপরীতে।

অতিরিক্ত চাহিদার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রো-রাটা বা আনুপাতিক পদ্ধতিতে সুকুক বরাদ্দ দিয়েছে। ব্যক্তি বিনিয়োগকারী, প্রভিডেন্ট ফান্ড, মিউচুয়াল ফান্ড ও ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স প্রতিষ্ঠানের ৭২৭টি সফল আবেদনের বিপরীতে প্রায় ৮৭ দশমিক ৩৭ কোটি টাকার সুকুক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

আগামী ২৯ জুন থেকে দ্বিতীয় বাজারে (সেকেন্ডারি মার্কেট) এ সুকুকের লেনদেন শুরু হবে। এর ফলে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, মিউচুয়াল ফান্ড এবং ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা প্রয়োজনে সুকুক কেনাবেচা করতে পারবেন, যা এর তারল্য আরও বাড়াবে।

বাংলাদেশে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে প্রথম দীর্ঘমেয়াদি সরকারি সুকুক চালুর পর শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগের বাজার ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। প্রথম স্বল্পমেয়াদি সুকুকের সফল নিলামের মধ্য দিয়ে সরকারের সুকুকের মাধ্যমে মোট তহবিল সংগ্রহ ৫৩ হাজার কোটি টাকার মাইলফলক অতিক্রম করল। একই সঙ্গে এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ পণ্যের চাহিদা দেশে দ্রুত বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের স্বল্পমেয়াদি ইসলামি সিকিউরিটিজের বাজার আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top