উদ্বোধনের দিনই সংশোধনের পথে এনবিআরের হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

Web Photo Card June 28 2026 Bangladesh
ছবি: ডিএসজে

প্রকল্প অনুমোদনের এক বছরের মাথায় ব্যয়ের শ্রেণিবিন্যাসে ভুল ধরা পড়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক হাজার কোটি টাকার অটোমেশন প্রকল্পে। মোট ব্যয়ের ৪০ শতাংশ বা ৪০০ কোটি টাকা পরামর্শক খাতে দেখানো হলেও পরে সেটিকে সফটওয়্যার উন্নয়নের ব্যয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে প্রকল্পের ব্যয়কাঠামো পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নিয়েছে পরিকল্পনা বিভাগ।

‘পরামর্শক’ খাতে বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস. এম. শাকিল আখতার স্বীকার করেছেন, অনুমোদনের আগে তাড়াহুড়োর কারণে ব্যয়ের শ্রেণিবিন্যাসে ভুল হয়েছে। তিনি জানান, যে ব্যয় পরামর্শক খাতে দেখানো হয়েছে, সেটি মূলত সফটওয়্যার উন্নয়নের ব্যয়। খুব শিগগিরই প্রকল্পটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

রবিবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘স্ট্রেনদেনিং ইনস্টিটিউশনস ফর ট্রান্সপারেন্সি অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি (সিটা)’ গুচ্ছ প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

সিটা প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়নাধীন ‘অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক দিচ্ছে ১ হাজার কোটি টাকা এবং বাকি অর্থ বাংলাদেশ সরকারের। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৪০০ কোটি টাকা পরামর্শক খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ২০২৫ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি সিটা প্রকল্পের মোট ব্যয় ৩ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) অর্থায়ন করছে ৩ হাজার ৪৩ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ সরকার দিচ্ছে ২৪৪ কোটি টাকা।

গুচ্ছ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান—পরিকল্পনা বিভাগ, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) অধীন বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় (ওসিএজি)।

প্রকল্পের লক্ষ্য হচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবাদান নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান প্রাপ্তি সহজ করা, কর পরিপালন বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ ও কার্যকর করা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা কার্যালয়ের বিশেষ সহকারী জোনায়েদ সাকি বলেন, অতীতে সরকারি অর্থ ব্যয়ে লাগামহীন লুটপাট ও অর্থপাচারের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই বর্তমান সরকার রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ নিয়েছে। সেই লক্ষ্যেই বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় সিটা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, পরিকল্পনা বিভাগ, এনবিআর, বিবিএস, বিপিপিএ এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের ডিজিটাল সক্ষমতা বাড়ানো গেলে রাজস্ব আহরণ, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা, নিরীক্ষা, তথ্য সংগ্রহ এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুণগত পরিবর্তন আসবে।

জোনায়েদ সাকি বলেন, বাজেট বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানো সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। তবে তা সম্ভব হবে কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, কার্যকর ও প্রযুক্তিনির্ভর করা গেলে। অটোমেশনের মাধ্যমে করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং করের আওতা সম্প্রসারণ সম্ভব হবে, যা রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি আরও বলেন, দেশের বাজেট এখনো মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় ছোট। অথচ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও অবকাঠামো খাতে ব্যয়ের প্রয়োজন ক্রমাগত বাড়ছে। তাই টেকসই উন্নয়নের জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।

সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়কে আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও কার্যকর করা জরুরি। এতে সরকারি অর্থের ব্যবহার আরও স্বচ্ছ হবে এবং অপচয়, দুর্নীতি ও অনিয়ম উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।

সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ই-জিপির সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর ক্রয়ব্যবস্থা সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করবে এবং প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা বাড়াবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সঠিক নীতিনির্ধারণের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্যের বিকল্প নেই। তাই তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানো হবে।

তিনি জানান, পরিকল্পনা বিভাগ এমন একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে, যার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার ও তথ্যভান্ডার পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। এতে তথ্য আদান-প্রদান সহজ হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি ও দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস. এম. শাকিল আখতারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে এনবিআরের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান, বিপিপিএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস. এম. মঈন উদ্দীন আহম্মেদ, আইএমইডির সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরী, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মো. ফিরোজ সরকার, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মো. নুরুল ইসলাম, বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যাঁ পেসমে, বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তা সেবাস্টিয়ান একার্ডটসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top