বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ‘সংস্কার’ শব্দটির বহুল ব্যবহার থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ ও ফলাফল নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান। নবম সানেম বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনের শেষ দিনে ‘সংস্কার নিয়ে মোহ: বাংলাদেশের গল্প’ শীর্ষক অধিবেশনে তিনি অত্যন্ত সোজাসাপ্টা ভাষায় বর্তমান পরিস্থিতির ব্যবচ্ছেদ করেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশে ঋণখেলাপিরা এখন কেবল সাধারণ কোনো অপরাধী নয়, তারা বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সংস্কারের পথে তারাই এখন সবচেয়ে বড় বাধা।
রেহমান সোবহানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সংস্কার কোনো একটি একক আইন বা নিছক ঘোষণা নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তিনি মনে করেন, প্রথমে একটি সুনির্দিষ্ট আইন হতে হবে, তারপর সেই আইন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করতে হবে। এরপর আসবে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সবশেষে এর ফলাফল মূল্যায়ন করা। কিন্তু বাংলাদেশে এই ধারাবাহিকতা অনুপস্থিত। ফলে অনেক ক্ষেত্রে সংস্কার কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় দলগুলো ইশতেহারে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রকৃত রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অভাব পরিলক্ষিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে দলের তৃণমূল কর্মীরা তো বটেই, খোদ কেন্দ্রীয় নেতারাও নিজেদের ইশতেহারের বিষয়বস্তু সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখেন না। অতীতে ছয় দফা আন্দোলনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, যেকোনো বড় সংস্কার তখনই সফল হয় যখন তা জনগণের ব্যাপক সমর্থন পায়। বর্তমানে গণভিত্তিক প্রচারণার এই অভাব সংস্কারের পথকে আরও সংকীর্ণ করে তুলছে।
সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতার ওপর গুরুত্বারোপ করে রেহমান সোবহান বলেন, যারা সরাসরি নীতিনির্ধারণী বা প্রশাসনিক পর্যায়ে কাজ করেননি, তাদের পক্ষে সংস্কারের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ বোঝা কঠিন। পরিকল্পনা কমিশনে নিজের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানান, আইন পাস করা সহজ, কিন্তু তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা এবং কায়েমি স্বার্থবাদীদের বাধা অতিক্রম করাই আসল সমস্যা। এক্ষেত্রে তিনি পুলিশ সংস্কারের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সংস্কার সফল হয়েছে কি না তা বোঝার উপায় হলো সাধারণ মানুষের সেবা পাওয়ার চিত্র। সাংবাদিকরা যদি থানায় গিয়ে সহজে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন, তবেই বোঝা যাবে সংস্কার কাজ করছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এগুলো নতুন কিছু নয়। সরকারগুলো কিস্তি পাওয়ার আশায় সাময়িক অগ্রগতি দেখায়, আবার উন্নয়ন সহযোগীরাও তাদের অর্থ বিতরণের লক্ষ্য পূরণে ব্যস্ত থাকে। ফলে এসব সংস্কার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়। নব্বইয়ের দশকে বিচার বিভাগীয় সংস্কার বা বাজেট সংস্কারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালে বোঝা যায় সেগুলোর প্রভাব ছিল অত্যন্ত সীমিত। বিশেষ করে রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট একীভূত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো দশকের পর দশক ধরে কেবল আলোচনাতেই থমকে আছে।
একই অধিবেশনে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সংস্কারকে বর্তমানে একটি ‘ফ্যাশন’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার অভাবে ভালো উদ্যোগগুলোও ব্যর্থ হচ্ছে। লুণ্ঠনমূলক উত্তরাধিকার, অনিয়ন্ত্রিত দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক-ব্যবসায়ী অলিগার্কির যোগসাজশকে তিনি সংস্কারের প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেন। ব্যাংক খাতের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য তাঁর বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন যে, সংস্কার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি চলমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া। তিনি সতর্ক করে বলেন, অনেক সংস্কারের উদ্যোগ জোরালোভাবে শুরু হলেও পরে তা দিক হারিয়ে ফেলে। বিশেষ করে অলিগার্কদের প্রভাবে আইনের যে সংশোধন বা পরিবর্তন হয়, তা জনস্বার্থের পরিপন্থী। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার জন্য আইনি কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হয়, যার সদুত্তর বা কোনো রাজনৈতিক ব্যাখ্যা জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হয় না। এই স্বচ্ছতার অভাবই মূলত সংস্কারের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে।
সবশেষে রেহমান সোবহান জোর দিয়ে বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই হলো সংস্কারের চূড়ান্ত পরীক্ষা। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন ব্যবস্থা ছাড়া জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। যত দিন পর্যন্ত কর্মসম্পাদনের ভিত্তিতে জনগণের রায়ের মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তনের সুস্থ সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত না হবে, তত দিন টেকসই সংস্কার কেবল মোহ বা আলেয়া হয়েই থাকবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও শক্তিশালী নাগরিক আন্দোলনের সমন্বয়ই পারে এই দুষ্টচক্র থেকে উত্তরণ ঘটাতে।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাবেক অর্থসচিব ও সাবেক সিএজি মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী।













