দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে দেউলিয়া আইন কার্যকর করার জোর দাবি জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। একই সঙ্গে ব্যাংকিং কোম্পানি আইনের অধীনে ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের’ কঠোর বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি এসব ব্যক্তিকে কোনো ব্যাংকের পরিচালক পদে বসার ক্ষেত্রে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার সুপারিশ করেছে এ ব্যবসায়ী সংগঠনটি।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘ব্যাংকিং খাতের সমন্বয়: ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক ফোকাস গ্রুপ আলোচনা সভায় এসব প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
মূল প্রবন্ধে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অস্থির পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে বলেন, বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার ৩১.২ শতাংশে পৌঁছেছে, যার বড় একটি অংশ বড় করপোরেট গ্রুপগুলোর ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ। তিনি জানান, বড় ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে মন্দ ঋণের হার ৪১.৩ শতাংশে উন্নীত হওয়া ব্যাংকগুলোর জন্য চরম আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলো ঋণ প্রদানে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে এবং ঝুঁকিমুক্ত ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
তাসকীন আহমেদ স্পষ্ট করে বলেন, যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধ করছেন না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যাংকিং কোম্পানি আইনের আওতায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ স্বতন্ত্র পরিচালক রাখা এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের পরিচালক হওয়া থেকে চিরতরে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব করেন।
তিনি জানান, ব্যাংক খাতে তারল্যের সংকট নেই, বরং রেকর্ড ৩ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে। তারপরও বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি সংকুচিত হয়ে ৬.০৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের ৭.১৫ শতাংশের তুলনায় অনেক কম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের কারণে যাতে সাধারণ উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয়ে সরকার কঠোর নীতি প্রণয়ন ও সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করবে। তিনি একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরির ওপর জোরারোপ করেন। বাংলাদেশের বাস্তবতায় ব্যাংক কোম্পানি আইনসহ আর্থিক খাতের অন্যান্য আইনের সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
তিনি জানান, শ্রমঘন শিল্প, যার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব, সেগুলোর উন্নয়নে বর্তমান সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এছাড়া ইতোমধ্যে বন্ধ হওয়া শিল্প-কারখানাগুলো চালুর পাশাপাশি অন্যান্য শিল্পখাতে উৎপাদন বাড়ানো এবং নারী উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
দেশের আর্থিক খাতের দুরাবস্থার বিষয়ে অবগত থাকার কথা জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, এ অবস্থা উত্তরণে সরকার প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়ন, সংস্কারসহ অন্যান্য উদ্যোগ গ্রহণ করবে। দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ঋণ ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য একটি শক্তিশালী বন্ড মার্কেট ও পুঁজিবাজার গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
অনুষ্ঠানে বিএবি-এর চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার বলেন, এসএমই ফাইন্যান্সিং সহজীকরণ করার কোনো বিকল্প নেই এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলো এ খাতে অর্থায়নে এগিয়ে এসেছে। এছাড়া সরকারের নীতিনির্ধারকসহ সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়ের অভাব রয়েছে, যার নিরসন প্রয়োজন বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
এনসিসি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. শামসুল আরেফিন জানান, ব্যাংকগুলো এখন ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সতর্ক ও রক্ষণশীল অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে বড় ঋণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কঠোর তদারকি চালানো হচ্ছে। সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক তথ্য সংরক্ষণের ঘাটতির কারণে তাদের ঋণ প্রদান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।
সিটি ব্যাংক পিএলসির উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশানুর রহমান জানান, আগামী বছর থেকে আইএফআরএস-৯ বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রভিশন রাখার সক্ষমতা কমবে এবং খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আরও প্রকট হবে। এই পরিস্থিতিতে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের লাগাম টেনে ধরা না গেলে ব্যাংক খাতের সক্ষমতা চরমভাবে হ্রাস পাবে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (গবেষণা) মো. আব্দুল ওয়াহাব বলেন, ঋণ পরিশোধে উদ্যোক্তাদের সময়সীমা রক্ষা না করার কারণে ব্যাংক ও উদ্যোক্তাদের আস্থার সম্পর্কটি নষ্ট হচ্ছে। এই সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাতে হলে খেলাপিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (এসএমই) নওশাদ মোস্তফা সঠিক তথ্যের ঘাটতি দূর করতে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালুর ওপর জোর দেন।
মুক্ত আলোচনায় বক্তারা বলেন, ব্যাংক খাতের এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে শুধুমাত্র ছোট উদ্যোক্তাদের চাপ না দিয়ে বড় ও প্রভাবশালী ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের আইনের আওতায় আনা এখন জরুরি। তাঁরা সরকারকে ব্যাংক থেকে মাত্রাতিরিক্ত ঋণ নেওয়া কমিয়ে উৎপাদনশীল বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ানোর আহ্বান জানান।













