বিদেশি ঋণ: ১০০ টাকা এলে ৮৮ টাকাই যাচ্ছে দেনা মেটাতে!

প্রতীকী চিত্র
প্রতীকী চিত্র

বিদেশের চড়া সুদের ঋণে মেগা প্রকল্পের যে উজ্জ্বল চিত্র একসময় আঁকা হয়েছিল, বর্তমানে তা দেশের অর্থনীতির জন্য এক দুঃসহ বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খোদ সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন এক উদ্বেগজনক বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে প্রাপ্ত বিদেশি ঋণের প্রায় ৮৮ শতাংশই ব্যয় হয়েছে আগের ঋণের কিস্তি পরিশোধে।

অর্থাৎ, এক হাত দিয়ে যে অর্থ দেশে ঢুকছে, অন্য হাত দিয়ে তার প্রায় পুরোটাই সুদ ও আসল হিসেবে দাতা সংস্থাগুলোর কাছে ফিরে যাচ্ছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত মাত্র ২৫০ কোটি ডলারের বিপরীতে ২১৯ কোটি ৫০ লাখ ডলারই ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, নতুন বিনিয়োগের চেয়ে এখন পুরোনো দেনা মেটানোই সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

বিদেশি অর্থছাড়ের এই ঐতিহাসিক নিম্নগতি মূলত মাঠপর্যায়ে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে চরম কাঠামোগত ব্যর্থতারই প্রতিফলন। উন্নয়ন সহযোগীদের নিয়ম অনুযায়ী কাজের অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে কিস্তি ছাড় করা হয়। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দক্ষ জনবলের অভাব এবং প্রয়োজনীয় তহবিলের সংকটে থমকে আছে অধিকাংশ বড় প্রকল্প।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ১৭ শতাংশের কিছু বেশি, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। বিশেষ করে ১৩টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের বরাদ্দকৃত বিদেশি ঋণের ৩ শতাংশও খরচ করতে সক্ষম হয়নি, যা দাতা সংস্থাগুলোর কাছে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

দাতাদের প্রতিশ্রুতির হারও এখন নিম্নমুখী। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ঋণের প্রতিশ্রুতি ২৩০ কোটি ডলার থেকে কমে ১৯৯ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। বিগত সরকারের আমলে কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগা প্রকল্পগুলো প্রবৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু হলেও বর্তমানে সেগুলো লাভের চেয়ে আর্থিক দায় হিসেবেই বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের ২০টি প্রধান প্রকল্পের মধ্যে ৪৩ বিলিয়ন ডলারই ছিল বিদেশি ঋণ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই বিপুল ঋণের বোঝা এখন বর্তমান প্রশাসনের ওপর পাহাড়সমান আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে। সঠিক কৌশল ও স্বচ্ছতা ছাড়া বিদেশি ঋণের ওপর অতিনির্ভরশীলতা শেষ পর্যন্ত জাতীয় অর্থনীতিকে নাজুক করে তুলেছে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top