রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত গতি নেই, অথচ সামনে বাড়ছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি এবং ভর্তুকির চাপ। একই সঙ্গে চলতি অর্থবছরের উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়েও তৈরি হয়েছে বড় অনিশ্চয়তা। ফলে আয় ও ব্যয়ের এই দ্বিমুখী চাপ সামলে সরকার কীভাবে অর্থনীতি পরিচালনা করবে, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে এ মূল্যায়ন তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা হয়েছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায় কম হয়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। অথচ চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে।
এ ধরনের প্রবৃদ্ধি অর্জন নিয়ে বড় ধরনের সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, ভালো সময়েও দেশের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি সাধারণত ১৪ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি হয়নি। ফলে চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে।
রাজস্ব ঘাটতির পাশাপাশি ব্যয়ের চাপও সরকারের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে। ড. দেবপ্রিয়র মতে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান ভর্তুকি—এই দুটি বিষয় আগামী দিনে সরকারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় বড় চাপ তৈরি করবে।
তিনি বলেন, রাজস্ব ঘাটতি পূরণে সরকারের বাজেট ঘাটতি বাড়ানোর সুযোগও সীমিত। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে সরকারের চুক্তি অনুযায়ী বাজেট ঘাটতি ৩ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে আয় কম হলে ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সরকারকে আরও সতর্ক হতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে ব্যয় কমানোর সুযোগ হিসেবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাইরে পরিচালন ও অনুন্নয়ন ব্যয়ের দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি। ড. দেবপ্রিয় বলেন, এসব খাতে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় কমানোর সুযোগ থাকতে পারে।
তবে ব্যয় সংকোচনের পাশাপাশি বেতন বৃদ্ধি ও ভর্তুকির মতো রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সংবেদনশীল ব্যয় কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, সেটিই সরকারের জন্য কঠিন সমীকরণ তৈরি করবে। একদিকে সরকারি কর্মীদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মজুরি সমন্বয়ের চাপ, অন্যদিকে জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে ভর্তুকির বাড়তি চাহিদা—দুই দিক সামলাতে হলে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়বে।
সিপিডির মূল্যায়নে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার সাতটি সূচকের মধ্যে তিনটিতে উন্নতি হলেও চারটিতে অবনমন হয়েছে। এনবিআরের রাজস্ব, মোট কর রাজস্ব, ব্যাংক ঋণ এবং নিট বৈদেশিক সহায়তার সূচকে অবনমন হয়েছে।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় সরকারের সামনে শুধু রাজস্ব বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ নয়; সীমিত সম্পদের মধ্যে কোন খাতে কত ব্যয় করা হবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রাজস্ব ঘাটতি ও ব্যয়ের চাপ একসঙ্গে বাড়লে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থায়নের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
সিপিডির মতে, তাই চলতি অর্থবছরে সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানো এবং একই সঙ্গে ব্যয়ের কঠোর অগ্রাধিকার নির্ধারণ। অন্যথায় বেতন বৃদ্ধি ও ভর্তুকির বাড়তি চাপ সামাল দিতে গিয়ে সামগ্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনায় আরও বড় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।













