ডলারের দাম ১২৮ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার পেছনে কারা কাজ করছে—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে মানি চেঞ্জার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এমসিএবি)। সংগঠনটির দাবি, লাইসেন্সপ্রাপ্ত মানি চেঞ্জাররা নির্ধারিত দরের মধ্যেই ডলার কেনাবেচা করছেন। ফলে ১২৮ টাকা বা তার বেশি দামে যারা ডলার লেনদেন করছে, তাদের পরিচয় ও কার্যক্রম তদন্ত করে প্রকৃত কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে ব্যাংকগুলো ডলার এনডোর্স করলেও অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীদের নগদ ডলার না দেওয়ায় খোলা বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।
সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীতে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এমসিএবির সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী গৌতম দে এসব কথা বলেন। সংগঠনের সভাপতি এম এস জামানের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় নেতারা ও বিভিন্ন মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
গৌতম দে বলেন, দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ মানি চেঞ্জার ব্যবসায়ী সৎভাবে ও নিয়ম মেনে ব্যবসা করছেন। কোনো ব্যবসায়ী অনিয়ম করলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সংগঠনের আপত্তি নেই। তবে বিচ্ছিন্ন কোনো অনিয়মের দায় পুরো বৈধ মানি চেঞ্জার খাতের ওপর চাপানো হলে সেটি ব্যবসায়ীদের প্রতি অন্যায় হবে।
তাঁর দাবি, নির্দিষ্ট প্রমাণসহ অবৈধ ও লাইসেন্সবিহীন মানি চেঞ্জিং প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও দীর্ঘ সময়েও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখন বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কারা ডলারের দাম বাড়াচ্ছে, তা শনাক্ত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
এমসিএবির হিসাবে, বর্তমানে খোলা বাজারে ডলারের দর ১২২ টাকা ৪৮ পয়সা থেকে ১২২ টাকা ৬০ পয়সার মধ্যে থাকার কথা। এর সঙ্গে ব্যবসায়িক ব্যয় ও মার্জিন বিবেচনায় নিয়ে প্রতি ডলারের ক্রয়মূল্য ১২৫ টাকা ৫০ পয়সা এবং বিক্রয়মূল্য ১২৬ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করেছে সংগঠনটি। সদস্যদের এই নির্ধারিত দরের বাইরে লেনদেন না করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
এখানেই সংগঠনটির মূল প্রশ্ন—এমসিএবি নির্ধারিত বিক্রয়দর যখন ১২৬ টাকা ৫০ পয়সা, তখন ১২৮ টাকা বা তার বেশি দামে ডলার লেনদেন হচ্ছে কোথায় এবং কার মাধ্যমে? সংগঠনটির দাবি, এই দামের সঙ্গে বৈধ মানি চেঞ্জারদের ব্যবসার সামঞ্জস্য নেই।
ডলার বাজারে চাপ তৈরির আরেকটি কারণ হিসেবে ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথা বলেছে এমসিএবি। গৌতম দে বলেন, ব্যাংকগুলো বিদেশগামী যাত্রীদের ডলার এনডোর্স করলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নগদ ডলার দিতে পারে না। ফলে এনডোর্সমেন্ট থাকা সত্ত্বেও যাত্রীরা খোলা বাজার থেকে নগদ ডলার কিনতে বাধ্য হন। এতে স্বাভাবিকভাবেই নগদ ডলারের চাহিদা বাড়ে।
এ পরিস্থিতিতে অনুমোদিত ডিলার বা এডি ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী নগদ ডলার সরবরাহের নির্দেশনা দেওয়ার দাবি জানিয়েছে এমসিএবি। একই সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতায় ডলার এনডোর্সমেন্টের সীমা পুনর্বিবেচনারও দাবি করা হয়েছে।
ডলার বাজারের কারসাজি শনাক্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে যৌথ মনিটরিং টিম গঠনের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। এমসিএবির বক্তব্য, তাদের প্রয়োজনীয় তদারকি ক্ষমতা দেওয়া হলে অবৈধ লেনদেন শনাক্তে সহযোগিতা করা সম্ভব।
এদিকে বৈধ ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধের দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি। ভ্যাট বা আয়কর ফাঁকির অভিযোগ থাকলে তদন্ত ও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে তাদের আপত্তি নেই। তবে অভিযোগ প্রমাণের আগে হয়রানি বন্ধ করতে হবে বলে দাবি তাদের।
সংবাদ সম্মেলনে এমসিএবি সভাপতি এম এস জামান বলেন, মানি চেঞ্জাররা মূলত নগদ বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচা করেন। তাদের ব্যবসার পরিধি সীমিত হওয়ায় পুরো ডলার বাজার নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা তাদের নেই। তাঁর দাবি, ডলার বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতার কারণ খুঁজতে হলে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের চ্যানেলও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এমসিএবি জানিয়েছে, অবৈধ ও লাইসেন্সবিহীন মানি চেঞ্জারদের একটি তালিকা বাংলাদেশ ব্যাংক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটি বলছে, তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের লিখিত নির্দেশনা অনুসরণ করেই ব্যবসা পরিচালনা করছে।
তবে দাবি-দাওয়ার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর চাপও বাড়িয়েছে সংগঠনটি। গৌতম দে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে এক সপ্তাহের সময় দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে সমস্যাগুলোর যৌক্তিক সমাধান না হলে ব্যবসায়ীদের স্বার্থে কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে ডলার বাজারের সাম্প্রতিক অস্থিরতায় এমসিএবির বক্তব্য একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—বৈধ মানি চেঞ্জারদের বাইরে ১২৮ টাকা বা তার বেশি দামে যে ডলার লেনদেন হচ্ছে, তার উৎস কোথায়? এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এবং অবৈধ বাজারের প্রকৃত কারসাজিকারীদের শনাক্ত করাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য বড় পরীক্ষা।













