চট্টগ্রাম বন্দরের মূল্যবান জায়গা আটকে আছে বছরের পর বছর পড়ে থাকা প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা মূল্যের আমদানি পণ্যে। প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার টন এসব পণ্যের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে খালাস না হওয়ায় বন্দরের সক্ষমতার ওপর তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ। এবার সেই আটকে থাকা পণ্য সরিয়ে জায়গা খালি করার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আদায়ের উদ্যোগ নিয়েছে কাস্টমস হাউস, চট্টগ্রাম। প্রথম ধাপে ৪৪২ কনটেইনার পণ্য ২১০ লটে ই-নিলামে তোলা হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সোমবার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, বন্দরের কনটেইনার জট কমানো, পরিচালন সক্ষমতা বাড়ানো এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধে এ নিলাম আয়োজন করা হচ্ছে। নিলাম হবে পুরোপুরি ডিজিটাল পদ্ধতিতে।
চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আমদানি করা পণ্য এখনো বন্দরে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। এসব পণ্যের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার টন এবং আনুমানিক মূল্য প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা এসব চালান বন্দরের মোট সক্ষমতার প্রায় ১৮ শতাংশ জায়গা দখল করে আছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
কাস্টমসের বিশেষ ই-অকশন নং-১০/২০২৬-এর আওতায় ১০১ লটে ২৯০ কনটেইনার পণ্য নিলামে উঠবে। এসব চালানে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল, যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ, প্লাস্টিক ওয়েস্টেজ, চেস্ট ফ্রিজার, পাইপ, সুতা, কাপড়, সোলার মডিউল, লবণ, কাগজ, টাইলস ও গৃহস্থালি পণ্য। এর সঙ্গে রয়েছে ৮৬টি পুরোনো খালি কনটেইনার।
এই নিলামের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এসব পণ্যের জন্য কোনো সংরক্ষিত মূল্য নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে বাজারে পণ্যের প্রকৃত চাহিদা ও দরদাতাদের প্রতিযোগিতার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত দাম নির্ধারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ই-অকশন নং-০৯/২০২৬-এর আওতায় ১০৯ লটে আরও ১৫২ কনটেইনার পণ্য বিক্রি করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ, ফেব্রিক্স, পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানার, কেমিক্যাল, এসির যন্ত্রাংশ, টাইলস, স্টেইনলেস স্টিল কয়েল, স্ক্যানার, ব্যাডমিন্টন র্যাকেট, এলিভেটর ও লবণসহ বিভিন্ন পণ্য।
কাস্টমসের কর্মকর্তারা বলছেন, আমদানিকারকেরা বিভিন্ন কারণে পণ্য খালাস না করে রেখে দেন। বাজারদর পড়ে যাওয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বা ছাড়পত্র না পাওয়া এবং আমদানি-সংক্রান্ত অনিয়মের জরিমানা পরিশোধে অনাগ্রহ—এসব কারণে অনেক চালান পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় বন্দরে পড়ে থাকায় অনেক পণ্যের মান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বন্দরের জায়গাও আটকে থাকে।
এবার সেই জট কাটাতে নিলাম প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি অনলাইনে নেওয়া হয়েছে। ই-অকশন নং-০৯/২০২৬-এর পণ্য ৩০ আগস্ট থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর এবং বিশেষ ই-অকশন নং-১০/২০২৬-এর পণ্য ৩০ আগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অফিস চলাকালে সরেজমিনে পরিদর্শন করা যাবে।
আগ্রহী ক্রেতারা কাস্টমসের অফিসিয়াল ই-অকশন পোর্টালে নিবন্ধন করে ২৭ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩টা পর্যন্ত প্রথম নিলামের দরপত্র এবং ২৭ আগস্ট থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩টা পর্যন্ত বিশেষ নিলামের দরপত্র জমা দিতে পারবেন। অনলাইন বিডের সময় প্রস্তাবিত দরের কমপক্ষে ১০ শতাংশ জামানতের স্ক্যান কপি আপলোড করতে হবে।
নিলাম-পরবর্তী প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ দরদাতাদের আমদানি নীতি আদেশের প্রযোজ্য শর্ত পূরণ করে পণ্য খালাস নিতে হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিনের পণ্যজটের প্রেক্ষাপটে এই নিলাম তাই শুধু পরিত্যক্ত পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নয়। প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার আটকে থাকা পণ্য থেকে অর্থনৈতিক মূল্য উদ্ধার, বন্দরের জায়গা পুনরুদ্ধার এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় কমানোর একটি বড় পদক্ষেপ। তবে নিলামের পর কত দ্রুত পণ্য সরানো যায় এবং তা থেকে সরকার কতটা রাজস্ব আদায় করতে পারে—সেটিই হবে উদ্যোগটির বাস্তব সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।













