বাংলাদেশে বিনিয়োগের পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো সরকারি সেবার জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হওয়া। সেই জটিলতা কমিয়ে বিনিয়োগসেবাকে এক ছাতার নিচে আনতে বিডা, বেজা ও পিপিপিএকে একীভূত করে যাত্রা শুরু করেছে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’। নতুন এই কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য—বিনিয়োগকারীকে এক জায়গা থেকে দ্রুত, সমন্বিত ও পূর্বানুমানযোগ্য সেবা দেওয়া।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬-এর আওতায় গেজেট প্রকাশের পর প্রথম কর্মদিবসেই রবিবার (২৩ আগস্ট) আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করেছে নতুন কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে প্রকাশ করা হয়েছে এর নতুন ব্র্যান্ড পরিচয়।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষকে (পিপিপিএ) একীভূত করে গঠিত ইনভেস্ট বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বিনিয়োগ উন্নয়নের কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।
নবগঠিত ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান, সচিব ও সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চেয়ারম্যান হিসেবে চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনকে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে তিনি বিডার চেয়ারম্যান ছিলেন।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬-এর ধারা ৪-এর উপধারা (৫) অনুযায়ী যোগদানের তারিখ থেকে এক বছরের জন্য তাঁকে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল মো. শাহারুল হুদাকে সচিব পদমর্যাদায় এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. আ. রাজ্জাক সরকারকে সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সদস্য (সচিব) পদে পদায়ন করা হয়েছে।
বিনিয়োগকারীর সুবিধা কোথায়?
নতুন কাঠামোর বড় পরিবর্তন হতে পারে বিনিয়োগকারীর জন্য সরকারি দপ্তরের সংখ্যা কমে আসা। অনুমোদন, নিবন্ধন, আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত সেবা, প্রণোদনা, শিল্পাঞ্চল এবং বিভিন্ন সরকারি সেবার জন্য আলাদা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের পরিবর্তে এক প্ল্যাটফর্ম থেকে সমন্বিত সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ।
নতুন আইন লাইসেন্স, অনুমোদন ও সরকারি সেবা দেওয়ার পদ্ধতি এবং সময়সীমা নির্ধারণের সুযোগ তৈরি করেছে। ফলে কোন সেবা কত সময়ে পাওয়ার কথা, সে বিষয়ে আরও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বিনিয়োগ
বিডা, বেজা ও পিপিপিএ একীভূত হওয়ায় অর্থনৈতিক অঞ্চল, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল এবং ঘোষিত অন্যান্য শিল্পাঞ্চলকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে। এসব এলাকায় বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও পরিবহন অবকাঠামোর সংযোগ তুলনামূলকভাবে দ্রুত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে প্রকল্পের ধরন ও বিনিয়োগকারীর প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরের প্রকল্পেও ইনভেস্ট বাংলাদেশ সহায়তা করবে।
এ ছাড়া অব্যবহৃত সরকারি জমি, স্থাপনা, শেয়ার ও অন্যান্য স্বত্ব উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করেছে নতুন আইন।
পিপিপি প্রকল্পে কী বদলাবে?
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) প্রকল্প অনুমোদনের কাঠামো আরও স্পষ্ট করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ছোট আকারের পিপিপি প্রকল্পের অনুমোদন সহজ করার লক্ষ্য রয়েছে।
এর ফলে অবকাঠামো ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বেসরকারি বিনিয়োগ যুক্ত করার প্রক্রিয়া দ্রুত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে অনুমোদন প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত হয় এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় কতটা কার্যকর হয় তার ওপর।
ডিজিটাল সেবায় জোর
ইনভেস্ট বাংলাদেশ ‘বাংলাবিজ’ পরিচালনা অব্যাহত রাখবে। এটি বাংলাদেশের বিনিয়োগসেবার একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। এর মাধ্যমে ব্যবসার লাইসেন্স ও বিভিন্ন অনুমতিপত্র অনলাইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
নতুন কর্তৃপক্ষ ১৪ দিনের ব্যবসায়িক লাইসেন্সিং কাঠামো কার্যকর করার কাজ করছে। দ্রুত ও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবসা পরিবেশ গড়ার সরকারি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে মার্চে ঘোষণা করা বিভিন্ন অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের যে সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল, সেটিও শেষের দিকে। সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে এসব উদ্যোগের অগ্রগতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের কথা জানিয়েছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ।
পুরোনো সেবার কী হবে?
বিডা, বেজা ও পিপিপিএ একীভূত হলেও বিদ্যমান বিনিয়োগসেবা বন্ধ হচ্ছে না। এসব প্রতিষ্ঠানের চলমান সেবাগুলো ইনভেস্ট বাংলাদেশের অধীনেই চালু থাকবে। অর্থাৎ একীভূতকরণটি মূলত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পরিবর্তন; লক্ষ্য বিনিয়োগকারীর জন্য পথ সহজ করা এবং এক জায়গা থেকে সমন্বিত সেবা দেওয়া।
বিডা, বেজা ও পিপিপিএর নিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সমমানের পদে ইনভেস্ট বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্ত হবেন। তাঁদের চাকরির ধারাবাহিকতা ও বর্তমান সুযোগ-সুবিধা বহাল থাকবে। পরামর্শক, আউটসোর্সিং কর্মী ও দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মীরা বর্তমান চুক্তি বা আদেশের শর্ত অনুযায়ী কাজ চালিয়ে যাবেন।
বাস্তবায়নেই সাফল্যের পরীক্ষা
তিন প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করে নতুন কর্তৃপক্ষ গঠন করলেই বিনিয়োগের পরিবেশ বদলে যাবে না। নতুন কাঠামোর মূল পরীক্ষা হবে বাস্তব সেবায়—লাইসেন্স ও অনুমোদনের সময় কমানো, সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয় বাড়ানো, বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং বিনিয়োগকারীদের দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে পারায়।
ফলে ইনভেস্ট বাংলাদেশ শুধু তিনটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক একীভূতকরণ নয়; এর সাফল্য নির্ভর করবে বিনিয়োগকারীর জন্য সরকারের বিভিন্ন দরজা কতটা কার্যকরভাবে এক জায়গায় নিয়ে আসতে পারে তার ওপর।













