জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা হারানো শিল্পকারখানাগুলোকে সাময়িক স্বস্তি দিতে খেলাপি ঋণ ঘোষণার সময়সীমা ছয় মাস থেকে বাড়িয়ে ১২ মাস করার আবেদন জানিয়েছে বিকেএমইএর নারায়ণগঞ্জ জোনের সদস্যরা। একই সঙ্গে জুন ও জুলাই মাসের গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল আগামী ১২ মাসে কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ এবং সংকটকালে বকেয়ার কারণে সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
দুর্ঘটনা ও বৈশ্বিক কারণে সৃষ্ট সাম্প্রতিক গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে বিকেএমইএর নারায়ণগঞ্জ জোনের সদস্যদের নিয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব দাবি তুলে ধরা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।
সভায় উদ্যোক্তারা বলেন, প্রায় এক মাস ধরে গ্যাস সংকটে অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ বা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এতে রপ্তানি কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় কমেছে এবং আর্থিক দায় পরিশোধের সক্ষমতাও দুর্বল হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ তৈরি হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
উদ্যোক্তারা জানান, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাবের কারণে রপ্তানি বাণিজ্য আগে থেকেই চাপের মধ্যে ছিল। এর সঙ্গে দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কারখানার বেতন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ঋণের কিস্তি ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহাল রয়েছে।
এ অবস্থায় বর্তমান ছয় মাসের পরিবর্তে ঋণ খেলাপি হিসেবে ঘোষণার সময়সীমা ১২ মাস করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয়। উদ্যোক্তাদের মতে, এতে সাময়িক সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুদ্ধারের সময় দেওয়া সম্ভব হবে এবং উৎপাদন স্বাভাবিক হওয়ার পর ঋণ পরিশোধের সুযোগ তৈরি হবে।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল পরিশোধেও বিশেষ সুবিধা চেয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, নিয়মিত বকেয়ার পাশাপাশি জুন ও জুলাই মাসের গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল আগামী ১২ মাসে কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে এই সময়ের মধ্যে বকেয়া বিলের কারণে কোনো গ্রাহকের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সভায় অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। অবিলম্বে সব ধরনের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, অবৈধ সংযোগ বন্ধ করা গেলে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি সিস্টেম লসও কমানো সম্ভব হবে।
গ্যাস সংকট মোকাবিলায় গণপরিবহনকে বাদ দিয়ে ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়িতে সিএনজি সরবরাহ বন্ধ রাখার প্রস্তাবও দেন তারা। এতে শিল্প ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে গ্যাস সরবরাহের চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা।
বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত তথ্য প্রকাশেরও দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সংকটের উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানাতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তারা।
উদ্যোক্তাদের মতে, গ্যাস সরবরাহের পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে কারখানাগুলো উৎপাদন, শ্রমিক ব্যবস্থাপনা, রপ্তানি ও কাঁচামাল সংগ্রহের বিষয়ে আগাম পরিকল্পনা করতে পারবে। এতে শিল্প খাতে অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তি কমবে।
সভায় বিকেএমইএর সদস্যরা বলেন, জ্বালানি সংকট কেবল উৎপাদন ব্যাহত করছে না; এর প্রভাব পড়ছে রপ্তানি, কর্মসংস্থান, ব্যাংকঋণ পরিশোধ এবং সামগ্রিক ব্যবসায়িক সক্ষমতার ওপর। ফলে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি সাময়িক আর্থিক সংকটে পড়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।
তারা এসব দাবি সরকারের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে তুলে ধরে দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে বিকেএমইএর প্রতি আহ্বান জানান।













