উদ্ভট উটের পিঠে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা

DSJ Web Photo Mamun
ডিএসজে

একটি জাতির ভবিষ্যৎ কোথায় লেখা থাকে? রাষ্ট্রের বাজেটের পাতায়, সংসদের বক্তৃতায়, উন্নয়নের চকচকে বিলবোর্ডে নাকি একটি শ্রেণিকক্ষের নীরব বেঞ্চে বসে থাকা কিশোরের চোখে? ভবিষ্যৎ লেখা থাকে আসলে সেই চোখেই। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ-নির্মাণের কারখানাটিই যদি ভুল নকশায় তৈরি হয়? তাহলে বিপদ শুধু একটি প্রজন্মের নয়, বিপদ গোটা জাতির।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে মনে হবে কবি শামসুর রাহমানের সেই তীব্র ব্যঙ্গাত্মক উচ্চারণ—“উটের পিঠে চলছে স্বদেশ।” আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও যেন সেই উটের পিঠে চড়ে অজানা কোনো মরুভূমির দিকে এগিয়ে চলছে। সামনে মরীচিকা, পেছনে ধুলোর ঝড়; আর উটের পিঠে বসে থাকা তরুণদের হাতে কেবল সার্টিফিকেটের পুঁটলি। কোথায় যাব, কেন যাব, সেখানে গিয়ে কী করব—এই তিনটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর যেন কেউ জানে না।

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার এক ভয়াবহ পরিহাস হলো অনেক তরুণের ক্ষেত্রে শিক্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের দরজা খুলছে না; বরং বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি বছর, কোথাও পাঁচটি বছর, কোথাও তারও বেশি সময় ধরে একজন তরুণ পড়ছে। বাবা জমি বিক্রি করছেন, মা গয়না বন্ধক রাখছেন, পরিবার সংসারের নানা প্রয়োজন ছেঁটে সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাচ্ছে। আত্মীয়স্বজন বলছে, “ছেলেটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।” পরিবার গর্বিত। তারপর একদিন সেই ছেলেটি হাতে সনদ নিয়ে ঘরে ফেরে। সেদিনও পরিবার গর্বিত থাকে।

কিন্তু কয়েক মাস পর প্রশ্ন আসে—“চাকরি হলো?” আর সেই প্রশ্নটি ধীরে ধীরে পরিণত হয় আরেক প্রশ্নে—“কী করছ এখন?” এরপর আরেকটু সময় গেলে প্রশ্নটি আর উচ্চারিত হয় না। নীরবতা নিজেই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। এই নীরবতার ভেতরেই জন্ম নেয় হতাশা।

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার সামগ্রিক বেকারত্বের তুলনায় অনেক বেশি। বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণায় এমন তথ্য দীর্ঘদিন ধরেই উঠে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে গিয়ে বছরের পর বছর অপেক্ষা করছেন। কেউ বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কেউ ব্যাংকের চাকরির পরীক্ষায় ছুটছেন, কেউ একের পর এক নিয়োগ পরীক্ষায় আবেদন করছেন।

আর কেউ হয়তো শেষ পর্যন্ত এমন একটি কাজে ঢুকছেন, যা তাঁর অর্জিত শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে সামান্যও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সনদ আছে, কিন্তু দক্ষতা নেই। ডিগ্রি আছে, কিন্তু কাজ নেই। সময় আছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ নেই। এটিই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে নির্মম আয়না।

কাগুজে ডিগ্রি তৈরি হচ্ছে, নাকি মানুষ?

ইতিহাস, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বাংলা, ইংরেজি, ইসলামের ইতিহাস কিংবা অন্যান্য মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান কোনোভাবেই অপ্রয়োজনীয় বিষয় নয়। বরং একটি সভ্য সমাজের আত্মা এসব জ্ঞানশাখার মধ্যেই বেঁচে থাকে। যে জাতি ইতিহাস জানে না, সে নিজের ভুলের পুনরাবৃত্তি করে। যে সমাজ দর্শনচর্চা করে না, সে প্রশ্ন করতে ভুলে যায়। যে রাষ্ট্র মানবিকতা শেখে না, তার উন্নয়নও একদিন নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে পারে।

সমস্যা বিষয়গুলোর অস্তিত্বে নয়; সমস্যা পরিকল্পনাহীনতায়। সমস্যা হলো শ্রমবাজারের সঙ্গে শিক্ষার কোনো কার্যকর সেতু না বানিয়ে বছরের পর বছর একই কাঠামোয় লাখ লাখ তরুণকে ঠেলে দেওয়া। একটি বিশ্ববিদ্যালয় যখন প্রতিবছর হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট তৈরি করে, তখন তার কি জানা উচিত নয় এই গ্র্যাজুয়েটদের কতজন কোথায় কাজ করবে?

একটি কলেজে যখন নতুন বিষয়ে অনার্স খোলা হয়, তখন কি প্রশ্ন ওঠা উচিত নয়—এই বিষয়ে আগামী পাঁচ বছরে দেশে কতজন দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন? শিক্ষা পরিকল্পনা যদি শ্রমবাজারের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত না হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় ধীরে ধীরে জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান থেকে সনদ বিতরণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। আর তখন শিক্ষার্থী হয়ে ওঠে একজন “সার্টিফিকেটধারী চাকরিপ্রার্থী”। মানুষ নয়, কাগজ তৈরি হয়।

বেকারের লম্বা পাইপলাইন

আমাদের সামনে এখন যে সমস্যাটি দাঁড়িয়ে আছে, সেটিকে বলা যায় “বেকারের পাইপলাইন”। প্রতি বছর নতুন ব্যাচ বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকছে। চার বছর পর তারা বের হচ্ছে। তাদের জায়গায় আবার নতুন ব্যাচ ঢুকছে। একদিকে উচ্চশিক্ষার বিস্তার, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সীমিত দরজা। ফলে পাইপলাইনে জমছে তরুণ। একজন, দুজন নয়—লাখ লাখ।

এই তরুণদের প্রত্যেকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং অসংখ্য ত্যাগের গল্প। একজন কৃষক হয়তো তাঁর সন্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি দিতে নিজের ধানের জমির একাংশ বিক্রি করেছেন। একজন রিকশাচালক হয়তো ছেলের মেসের ভাড়া দিতে দিনের পর দিন অতিরিক্ত কয়েক ঘণ্টা রিকশা চালিয়েছেন।

একজন পোশাকশ্রমিক মা হয়তো নিজের প্রয়োজনের কাপড় না কিনে মেয়ের কোচিংয়ের টাকা দিয়েছেন। এই অর্থ শুধু টাকা নয়। এটি মানুষের ঘাম। এটি মায়ের চোখের জল। এটি বাবার অসমাপ্ত স্বপ্ন। তাই একজন তরুণকে চার-পাঁচ বছর পড়িয়ে শেষে যদি তাকে বলা হয়, “এখন তুমি নিজেই দেখো কী করা যায়”, তাহলে সেটি শুধু শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনারও ব্যর্থতা।

বিসিএসে অসুস্থ প্রতিযোগিতা

শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি বিসিএস-কেন্দ্রিক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। সরকারি চাকরি সম্মানের। রাষ্ট্রের সেবা করার সুযোগও মহৎ। কিন্তু যখন একটি দেশের লাখ লাখ মেধাবী তরুণের কাছে বিসিএসই হয়ে ওঠে প্রায় একমাত্র কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ, তখন বুঝতে হবে কোথাও একটা বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে।

কারণ তরুণেরা তো চাকরি করতে চায়। তারা কাজ করতে চায়। তারা দক্ষ হতে চায়। তারা আয় করতে চায়। পরিবারকে সাহায্য করতে চায়। কিন্তু যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মদক্ষতা তৈরি করে না, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই অপেক্ষাকৃত নিরাপদ একটি দরজার দিকে ছুটে যায়—সরকারি চাকরি।

একজন তরুণ বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করলেন। প্রথম বছর আশা। দ্বিতীয় বছর অভিজ্ঞতা। তৃতীয় বছর উদ্বেগ। চতুর্থ বছর বয়সের হিসাব। পঞ্চম বছর হতাশা। এদিকে তাঁর বয়স বাড়ছে, কিন্তু দক্ষতা বাড়ছে না। সে যদি এই পাঁচ বছরে প্রোগ্রামিং শিখত, ডেটা অ্যানালিটিক্স শিখত, ডিজিটাল মার্কেটিং শিখত, ইংরেজি যোগাযোগ দক্ষতা বাড়াত, উদ্যোক্তা হওয়ার প্রশিক্ষণ নিত, কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বাস্তব কাজ করত, তাহলে হয়তো পাঁচ বছর পর তাঁর হাতে একটি চাকরি না থাকলেও থাকত একটি বিক্রয়যোগ্য দক্ষতা।

আমরা সেই দক্ষতাটিই তাকে দিইনি। আমরা তাকে দিয়েছি অপেক্ষা করতে।

সবচেয়ে আশার কথা হলো এখনও সব শেষ হয়ে যায়নি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। আমাদের সমস্যা মেধার অভাব নয়। সমস্যা হলো সেই মেধাকে সঠিক পথে পরিচালনার অভাব। যে তরুণ গ্রামের ছোট একটি ঘরে বসে ইউটিউব দেখে কোডিং শিখতে পারে, সে যদি সঠিক প্রশিক্ষণ, ইন্টারনেট, মেন্টরশিপ ও বাজারের সংযোগ পায়, তাহলে সে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে।

একজন বিশ্ববিদ্যালয়-গ্র্যাজুয়েট ছয় মাসের নিবিড় প্রশিক্ষণে নতুন দক্ষতা অর্জন করতে পারে। একজন ইতিহাসের ছাত্র ডিজিটাল আর্কাইভে কাজ করতে পারে। একজন বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক কনটেন্ট মার্কেটে কাজ করতে পারে। একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র ডেটাভিত্তিক নীতি গবেষক হতে পারে।

একজন সাধারণ গ্র্যাজুয়েট সাইবার সিকিউরিটি, সফটওয়্যার টেস্টিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, ডেটা অ্যানালিটিক্স কিংবা অন্য কোনো চাহিদাসম্পন্ন দক্ষতায় নিজেকে পুনর্গঠন করতে পারে। শুধু দরকার সুযোগের দরজা।

সবচেয়ে দ্রুত বাড়বে প্রযুক্তিনির্ভর চাকরি

শতকরা হারে দ্রুততম প্রবৃদ্ধির তালিকায় প্রযুক্তিনির্ভর পেশাগুলোর আধিপত্য স্পষ্ট। বিগ ডেটা স্পেশালিস্টের চাহিদা প্রায় ১১৩ শতাংশ বাড়তে পারে। ফিনটেক ইঞ্জিনিয়ার ৯৩ শতাংশ, এআই ও মেশিন লার্নিং স্পেশালিস্ট ৮২ শতাংশ, সফটওয়্যার ও অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপার ৫৭ শতাংশ এবং সিকিউরিটি ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্টের চাহিদা প্রায় ৫৩ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস রয়েছে।

এই পরিসংখ্যান আসলে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির ভাষা বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। আগামীর দিনের ব্যাংকিং শুধু শাখা, কর্মকর্তা আর কাগজের ফাইলের ব্যাংকিং হবে না। ফিনটেক, ডেটা অ্যানালিটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল পেমেন্টের সঙ্গে ব্যাংকিংয়ের সম্পর্ক আরও গভীর হবে।

একইভাবে শিল্পকারখানা, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠান—কোনো ক্ষেত্রই প্রযুক্তির এই ঢেউ থেকে বাইরে থাকবে না। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণা দূর করা প্রয়োজন। প্রযুক্তির চাকরি বাড়ছে মানেই ভবিষ্যতের সব চাকরি কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের জন্য—এমন নয়।

একজন বেকার তরুণ শুধু একজন চাকরিপ্রার্থী নয়। সে একজন বিনিয়োগের ফল। সে একটি পরিবারের আশা। সে একটি দেশের সম্ভাবনা। তার হাতে কাজ না থাকা মানে শুধু একটি আয় হারানো নয়; তার সঙ্গে হারিয়ে যায় উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যতের অসংখ্য সম্ভাবনা।

আর যখন হাজার হাজার, লাখ লাখ তরুণ একই অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকে, তখন সেটি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা থাকে না; তা হয়ে ওঠে জাতীয় সংকট। তাই বেকার তরুণকে আমরা “অযোগ্য” বলে পাশ কাটিয়ে যেতে পারি না। বরং প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি তাকে যোগ্য হওয়ার সুযোগ দিয়েছি?

যে শিক্ষার্থী বারো বছর স্কুলে পড়ে, চার বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, পরিবার তার পেছনে অর্থ ব্যয় করে, রাষ্ট্র ভর্তুকি দেয়—তারপরও যদি সে কর্মজগতের জন্য প্রস্তুত না হয়, তাহলে ব্যর্থতা শুধু তার নয়। ব্যর্থতা আমাদেরও।

শিক্ষাকে সনদ থেকে দক্ষতায়, ডিগ্রি থেকে কর্মযোগ্যতায়, মুখস্থবিদ্যা থেকে সৃজনশীলতায় এবং বেকারির পাইপলাইন থেকে মানবসম্পদের মহাসড়কে নিয়ে যেতে হবে। নইলে ইতিহাস একদিন আমাদের দিকে তাকিয়ে শুধু একটি প্রশ্নই করবে—এত তরুণ, এত মেধা, এত স্বপ্ন পেয়েও তোমরা তাদের জন্য কী করেছিলে? সেই প্রশ্নের উত্তর যেন আমাদের নীরবতায় হারিয়ে না যায়।

লেখক: খান এ মামুন

আহ্বায়ক, চাইল্ড গার্ডিয়ান নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (সিজিএনবি) এবং

প্রধান সমন্বয়ক, ফিনটক বাংলাদেশ

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top