অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তব চিত্রে স্বস্তির চেয়ে অস্বস্তিই বেশি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের তিন প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এতে সরাসরি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ, বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদনের গতি কমেছে; বেড়েছে আমদানি ও বাণিজ্য ঘাটতি। সব মিলিয়ে ৩১টি অর্থনৈতিক সূচকের ১৯টিতেই অবনমন দেখছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
সোমবার ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে এ মূল্যায়ন তুলে ধরে সিপিডি। প্রতিষ্ঠানটির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা নিয়ে নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও এখন পর্যন্ত সামগ্রিক পরিস্থিতিতে অস্বস্তির জায়গাই বেশি।
সিপিডির হিসাবে, জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে বন্ধ হয়েছে ৯৫টি কারখানা। একই সময়ে শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে শূন্যে এবং উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমেছে।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে হয়েছে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলার।
বিনিয়োগের দুর্বলতার আরেকটি চিত্র পাওয়া গেছে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানিতে। এ খাতের এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে নেমে ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। সিপিডির পর্যবেক্ষণ, অর্থনীতিতে আমদানি বাড়লেও তার বড় অংশ বিনিয়োগের মূলধনি পণ্যে যাচ্ছে না; বরং জ্বালানি ও এলএনজির মূল্যবৃদ্ধি আমদানি ব্যয় বাড়ানোর অন্যতম কারণ।
গ্যাস সংকটও শিল্পের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যা, এলএনজি সংগ্রহে জটিলতা ও কার্গো গ্রহণে সমস্যার কারণে দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে সিপিডি। এর প্রভাবে টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেলবোর্ড ও সিরামিকসহ গ্যাসনির্ভর শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিল্পে গ্যাসের ব্যবহার ১ হাজার ১৮৬ এমএমসিএফ থেকে কমে ১ হাজার ১৪৮ এমএমসিএফে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সূচকের প্রবৃদ্ধিও ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে।
রাজস্ব পরিস্থিতিতেও বড় চাপের আশঙ্কা করছে সিপিডি। চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হলেও বর্তমান প্রবণতায় ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে।
এনবিআরের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ১ শতাংশে এবং মোট কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে। ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার নির্ভরতাও ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে।
তবে অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও রয়েছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এর বিপরীতে আমদানি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতি ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। চলতি হিসাবের ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্তও পরিণত হয়েছে ৬০০ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতিতে। রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। মাসিক গড় বিদেশে কর্মসংস্থানও ৯৫ হাজার ৫২১ থেকে কমে ৫১ হাজার ২৩৫ জনে নেমেছে।
সিপিডির ৩১ সূচকের স্কোরকার্ডে ১২টিতে উন্নতি হলেও অবনমন হয়েছে ১৯টিতে। ড. দেবপ্রিয় বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এক বছরের মধ্যে শেষ হবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। দেশ এখন দীর্ঘায়িত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের দিকে যাচ্ছে।
তার মতে, সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরে কোনো সমন্বিত তথ্যভিত্তিক দলিল তৈরি না হওয়ায় বর্তমান অগ্রগতি মূল্যায়ন কঠিন হচ্ছে। একই সঙ্গে হালনাগাদ তথ্য প্রকাশে ঘাটতিও বড় সমস্যা তৈরি করছে।
সিপিডি অক্টোবর ২০২৬ থেকে জুন ২০২৭ মেয়াদের একটি ‘কোর বাজেট’ প্রণয়ন এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে সুরক্ষা বলয় তৈরির সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি জ্বালানি, ব্যাংক, এনবিআর, রাজস্ব-ব্যয়, এডিপি, লজিস্টিকস, ডিজিটালাইজেশন ও বেতন কমিশন নিয়ে সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ড. দেবপ্রিয়র ভাষায়, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার এখন আর শুধু প্রবৃদ্ধির প্রশ্ন নয়; বরং শিল্পে কর্মসংস্থান ধরে রাখা, বিনিয়োগ ফিরিয়ে আনা এবং রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর সমন্বিত চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দ্রুত ও সমন্বিত সংস্কারই এখন সবচেয়ে জরুরি।













