দেড় বছর ধরে নানা বাণিজ্যিক বাধায় আটকে থাকা বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যে আবার গতি ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ধ সীমান্ত হাট চালু, স্থলবন্দরগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা এবং স্থলপথে সুতা আমদানির বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার মতো বিষয় এখন দুই দেশের আলোচনার টেবিলে। পাশাপাশি যৌথ বিনিয়োগ ও উৎপাদনের মাধ্যমে শুধু পণ্য বেচাকেনা নয়, দুই দেশের শিল্পখাতকে আরও গভীরভাবে যুক্ত করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
সোমবার সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার। তবে গত দেড় বছরে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম কিছুটা ধীর হয়ে এসেছে। এখন এসব বাধা চিহ্নিত করে বাণিজ্যকে আরও সহজ ও কার্যকর করার পথ খোঁজা হচ্ছে।
দুই দেশের বাণিজ্যে আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে স্থলপথে সুতা আমদানির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পের জন্য সুতা গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। ফলে স্থলপথে আমদানির সুযোগ বাড়লে সরবরাহ সময় ও পরিবহন ব্যয়ের ক্ষেত্রে সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে এ সিদ্ধান্ত স্থানীয় স্পিনিং শিল্পের স্বার্থ ও আমদানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্য করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এর পাশাপাশি বন্ধ সীমান্ত হাটগুলো পুনরায় চালু এবং স্থলবন্দরগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যকর করার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। সীমান্ত হাট শুধু দুই দেশের সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর ছোট আকারের বাণিজ্যের সুযোগ নয়; এগুলো সীমান্ত অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও স্থানীয় পণ্যের বাজার তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
বাণিজ্য সম্প্রসারণে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য একটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাবও এসেছে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি ও বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া সহজ করার লক্ষ্য রয়েছে।
বৈঠকে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও দুই দেশের মানুষের উন্নয়ন ও অগ্রগতির স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। বাংলাদেশ ও ভারতকে সমতার ভিত্তিতে কাজ করার ওপরও গুরুত্ব দেন হাইকমিশনার।
শুধু আমদানি-রপ্তানি নয়, যৌথ বিনিয়োগ ও উৎপাদনের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের উদাহরণ দিয়ে হাইকমিশনার বলেন, ভারত জিপার, বোতাম, মেশিনারি ও অন্যান্য উপকরণ সরবরাহের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্পকে সহযোগিতা করতে পারে। এতে দুই দেশের শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থার পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে স্থলপথের বিধিনিষেধের প্রভাব পড়েছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল; একই সময়ে ভারতও বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্যের স্থলপথে প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করে। ফলে কিছু বাণিজ্য সমুদ্রপথে সরিয়ে নিতে হয়েছে, যা সময় ও লজিস্টিক ব্যয় বাড়িয়েছে।
এখন নতুন উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো সেই বাণিজ্যিক ঘর্ষণ কমিয়ে সরবরাহব্যবস্থাকে আবার কার্যকর করা। প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বিবেচনায় নিলে স্থলবন্দর, সীমান্ত হাট ও কাঁচামাল আমদানির প্রতিবন্ধকতা কমানোর প্রভাব শুধু সীমান্ত বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; পোশাক, টেক্সটাইল, শিল্প কাঁচামাল ও যৌথ বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে আলোচনা থেকে বাস্তব সিদ্ধান্তে পৌঁছানোই এখন বড় পরীক্ষা। সীমান্ত হাট পুনরায় চালু, স্থলবন্দর পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরানো এবং সুতা আমদানির বিধিনিষেধ প্রত্যাহার—প্রতিটি উদ্যোগ বাস্তবায়নে নীতিগত সিদ্ধান্ত, অবকাঠামো ও দুই দেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয় প্রয়োজন হবে।
সব মিলিয়ে নতুন উদ্যোগের তাৎপর্য শুধু বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ানো নয়; বরং দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ককে আবার সরবরাহব্যবস্থা, বিনিয়োগ ও যৌথ উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোয় নেওয়া। সেটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন গতি পাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ-ভারত অর্থনৈতিক সহযোগিতার পরবর্তী অধ্যায়ের ভিত্তিও তৈরি হতে পারে।













