আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থীদের জমা দেওয়া হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, এবারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থীদের প্রায় অর্ধেকই ব্যবসায়ী এবং প্রতি চারজন প্রার্থীর একজন ‘কোটিপতি’ ক্লাবের সদস্য।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী ১,৯৮১ জন প্রার্থীর মধ্যে ৪৮.৪৮ শতাংশের প্রধান পেশা ব্যবসা। এর বিপরীতে ‘রাজনীতি’কে পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন মাত্র ১.৫৬ শতাংশ প্রার্থী। অর্থাৎ, মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মীদের চেয়ে শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের মনোনয়ন পাওয়ার পাল্লা অনেক বেশি ভারী।
এক প্রশ্নের জবাবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “অর্থ, পেশিশক্তি এবং ধর্মকে পুঁজি করে রাজনীতিকে কুক্ষিগত করার প্রচেষ্টারত শক্তির কারণে ক্রমাগত সুস্থ রাজনীতির সম্ভাবনা সংকুচিত হচ্ছে।” বিত্তের দাপটে একদিকে যেমন ‘কোটিপতি’ প্রার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, তেমনি প্রার্থীদের সম্মিলিত ঋণের বোঝাও ছাড়িয়েছে ১৮,০০০ কোটি টাকা।
তবে বছরে অন্তত এক কোটি টাকা আয় করেন এমন প্রার্থীর সংখ্যা একাদশ ও দ্বাদশ নির্বাচনের তুলনায় অনেকটা কমে এসেছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের মধ্যে ১২৪ জন বছরে অন্তত এক কোটি টাকা আয় করেন। ২০০৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪৩ জন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে তা কিছুটা বেড়ে ৬২ হয়, ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৪৩ জন, আর ২০২৪ সালে সর্বোচ্চ ১৭৯ জন প্রার্থী অন্তত কোটি টাকা আয় করতেন।
হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোটিপতির দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বিএনপি, যাদের ২১২ জন প্রার্থী, অর্থাৎ মোট প্রার্থীর ৭১.৮৬ শতাংশই কোটিপতি। তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা জামায়াতে ইসলামীর ৫৩ জন বা প্রায় ২০ শতাংশ প্রার্থী কোটিপতির তালিকায় রয়েছেন, এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জাতীয় পার্টির ২৭ জন করে প্রার্থী কোটিপতি।
এ বছর অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদের মূল্য হিসাব করলে ২৭ জন শত-কোটিপতি প্রার্থীর তালিকা পাওয়া যায়। এই ২৭ জনের মধ্যে ১৮ জনই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপির। আর বাকি ৯ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী। তালিকার শীর্ষে আছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী মো. আমিনুল ইসলাম। তাঁর মোট সম্পদের বাজারমূল্য ৬১৯.৯০ কোটি টাকা। এরপরের দুজনও বিএনপির। তাঁরা হলেন আব্দুল আউয়াল মিন্টু এবং মো. জাকির হোসেন সরকার। তাঁদের সম্পদের বাজারমূল্য যথাক্রমে ৬০৭.৫৮ কোটি এবং ৫৮১.১১ কোটি টাকা।
আর স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থমূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের প্রার্থী এস. এ. কে. একরামুজ্জামান। তাঁর মোট সম্পদ মূল্য ৪৯৯.৪২ কোটি টাকা। এই তালিকার সবার শেষে আছেন রংপুর-৪ আসনের বিএনপি দলীয় প্রার্থী মোহাম্মদ এমদাদুল হক ভরসা। তাঁর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ মিলে বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী মোট সম্পদ আছে একশ পঁয়তাল্লিশ কোটি টাকা।
অস্থাবর সম্পদের ভিত্তিতে শীর্ষ ১০ প্রার্থীর মধ্যে ৭ জনই বিএনপির এবং বাকি ৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী। তালিকার শীর্ষে রয়েছেন বিএনপি দলীয় মো. আমিনুল ইসলাম, যাঁর অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৫৯৯.৭ কোটি টাকা, আর দ্বিতীয় স্থানে থাকা স্বতন্ত্র প্রার্থী এস. এ. কে. একরামুজ্জামানের সম্পদ ৪১৪ কোটি ১ লাখ টাকা।
স্থাবর সম্পদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবারের নির্বাচনে কমপক্ষে ১ একর জমি আছে এমন প্রার্থীর সংখ্যা আগের চারটি নির্বাচনের তুলনায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ৭৭৫ জন প্রার্থীর এই পরিমাণ জমি রয়েছে। কৃষি ও অকৃষি উভয় জমির মালিকানায় শীর্ষে রয়েছেন চট্টগ্রাম-১৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী মো. আব্বাস আলী, যাঁর কৃষি জমির পরিমাণ ৮৯৭.৯০ একর এবং অকৃষি জমি ৩৯২.৩৬ একর। ল্যান্ড রিফর্ম অ্যাক্ট-২০২৩ অনুযায়ী জমির মালিকানার একটি সর্বোচ্চ সীমা থাকলেও অন্তত ১০ জন প্রার্থীর কাছে আইনি সীমার চেয়ে অতিরিক্ত ভূমির মালিকানা পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, প্রার্থীদের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৮,৮৬৮ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকাই ব্যাংক ঋণ। নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের মধ্যে ৬৭ শতাংশেরই ব্যাংক ঋণ রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঋণ রয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থী এস. এ. কে. একরামুজ্জামানের, যাঁর দায়ের পরিমাণ ৩,১৫৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
যদিও বিগত পাঁচটি নির্বাচনের মধ্যে এবার ঋণগ্রস্ত প্রার্থীর হার সবচেয়ে কম (২৫.৫ শতাংশ), কিন্তু ঋণের মোট পরিমাণ আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। টিআইবি বলছে, এটি বড় ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের একটি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত হতে পারে। এক হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে এমন অন্য প্রার্থীরা হলেন—হবিগঞ্জ-৪ আসনের এস এম ফয়সল (২,০৪১.৪৮ কোটি টাকা), ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের মো. খালেদ হোসেন মাহবুব (১,৪৭৯.৮২ কোটি টাকা), মানিকগঞ্জ-৩ আসনের আফরোজা খানম (১,৩৬০.৩৬ কোটি টাকা) এবং মুন্সিগঞ্জ-১ আসনের মো. আব্দুল্লাহ (১১৫.৭২ কোটি টাকা)। উল্লেখ্য, এঁরা সবাই বিএনপি মনোনীত প্রার্থী।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “ঋণখেলাপি ব্যবসায়ীদের বৈধতা দেওয়া নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্বের বরখেলাপ। মূলত কমিশনের সৎ সাহসের অভাবে তাঁদের মনোনয়ন অনুমোদন করা হয়েছে, যা নিন্দনীয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে খেলাপি ঋণের চর্চায় যারা শীর্ষে ছিল, তারাই রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ স্তর দখল করে কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করেছিল। এবারের সংসদেও যদি এ ধরনের চর্চা অব্যাহত থাকে, তা হবে চূড়ান্ত হতাশাজনক।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে নীতিকাঠামো পরিবর্তন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি থাকবে, নাকি নজিরবিহীন ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত সম্ভাবনার বাস্তবায়ন হবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।”
টিআইবি জানিয়েছে, গত পাঁচটি নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের সম্পদ বৃদ্ধির হার ছিল গাণিতিক হারের চেয়েও বেশি। দশম থেকে দ্বাদশ সংসদ পর্যন্ত শীর্ষ দশ এমপির আয় বেড়েছে ৮৫০ শতাংশ থেকে ৩,৫০০ শতাংশ পর্যন্ত। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থীদের চেয়ে তাঁদের স্ত্রী ও নির্ভরশীলদের সম্পদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি দেখা গেছে।
এবার ২৫৯ প্রার্থীর তুলনায় তাঁদের স্বামী-স্ত্রী বা নির্ভরশীলদের অস্থাবর সম্পদ বেশি, ১১৮ প্রার্থীর তুলনায় তাঁদের স্বামী-স্ত্রী/নির্ভরশীলদের দালান বা ফ্ল্যাট সংখ্যা বেশি এবং ১৬৪ প্রার্থীর তুলনায় তাঁদের স্বামী-স্ত্রী বা নির্ভরশীলদের জমির পরিমাণ বেশি।
প্রতিবেদনে শুধু দেশের সম্পদ নয়, বরং বিদেশে পাচারকৃত বা অর্জিত সম্পদের তথ্য গোপনের বিষয়টিও উঠে এসেছে। প্রার্থীরা যুক্তরাজ্যে ২১০ কোটি টাকার বাড়ি এবং দুবাইয়ে ফ্ল্যাটের তথ্য হলফনামায় গোপন করেছেন। অন্তত দুজন প্রার্থী তাঁদের ব্রিটিশ নাগরিকত্বের তথ্য উল্লেখ করেননি, যা নির্বাচনী আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ ছাড়া সম্পদ লুকাতে অনেক প্রার্থী দুবাই বা অন্যান্য ‘ট্যাক্স হ্যাভেন’ বা কর-স্বর্গে শেল কোম্পানির আশ্রয় নিয়েছেন বলে টিআইবি প্রমাণ পেয়েছে।
এ বছর ২১ জন প্রার্থী দ্বৈত নাগরিকত্বধারী ছিলেন এবং পরে ত্যাগ করেছেন। ৩১ জন প্রার্থী বৈদেশিক উৎস থেকে আয় করেন। ২৫ জন প্রার্থী বিদেশে অস্থাবর সম্পদ, বৈদেশিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা বিনিয়োগের তথ্য দিয়েছেন এবং ১৭ জন প্রার্থীর বাংলাদেশের বাইরে স্থাবর সম্পদ বা জমিজমা আছে।
এবারের সংসদ নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা ১,৯৮১ জন, যার মধ্যে প্রায় ১৩ শতাংশ স্বতন্ত্র। এই নির্বাচনে সকল দলের প্রার্থীদের ঘোষিত সর্বমোট নির্বাচনী ব্যয় ৪৬৩.৭ কোটি টাকা, প্রতিজন প্রার্থীর গড় ব্যয় সাড়ে ২২ লক্ষ টাকা। ঘোষিত সবচেয়ে বেশি ব্যয় বিএনপির—মোট ১১৯.৫ কোটি টাকা। আর দ্বিতীয় অবস্থানে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের মোট ব্যয় ৮০.৬ কোটি টাকা।
এবারের নির্বাচনে ইসলামপন্থী দলগুলোর প্রার্থীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়ে মোট প্রার্থীর ৩৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা বিগত ৫টি নির্বাচনের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে প্রতিবারের মতো এবারও নারী প্রার্থীর হার নগণ্য; জুলাই সনদে প্রস্তাবিত ৫ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা কোনো রাজনৈতিক দলই পূরণ করতে পারেনি।











