উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে চরম অদক্ষতা, আমলাতান্ত্রিক স্থবিরতা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার দীর্ঘদিনের ঘাটতির কারণে পাইপলাইনে থাকা বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ ছাড়ে বড় ধরনের ধস নেমেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুত ঋণ প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি প্রকৃত অর্থ ছাড়ের পরিমাণ নজিরবিহীনভাবে সংকুচিত হয়েছে। তীব্র অর্থসংকট ও মেগা রাজস্ব ঘাটতির এই ক্রান্তিকালে একদিকে যখন বিদেশি মুদ্রার জোগান কমছে, অন্যদিকে ঠিক তখনই অতীতের চড়া সুদের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ হু হু করে বাড়ছে। এই দ্বিমুখী ধাক্কা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর এক ভয়ংকর চাপ ও অশনিসংকেত তৈরি করেছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে দেশে বৈদেশিক ঋণের অর্থ ছাড়ের পরিমাণ ১৮ শতাংশ কমে মাত্র ৪২৩ কোটি মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে উন্নয়ন সহযোগীরা ৫১৬ কোটি ডলারের অর্থ ছাড় করেছিল। অর্থাৎ বছর ব্যবধানে দেশের বাজারে বিদেশি ঋণের জোগান কমে গেছে ৯২ কোটি ৭০ লাখ ডলার বা প্রায় ১১ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও এই বিপুল পরিমাণ ডলার বাংলাদেশ মূলত নিজের প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যর্থতার কারণেই আনতে পারছে না।
ঋণ ছাড়ের পাশাপাশি নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি পাওয়ার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। ১০ মাসে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বৈদেশিক ঋণ প্রতিশ্রুতি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৮০ কোটি ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল ৪২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বাংলাদেশের নতুন ঋণ পাওয়ার আইনি প্রতিশ্রুতি বা গ্যারান্টি কমেছে ১৪৫ কোটি ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ১৭ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার সমপরিমাণ। এই ধস স্পষ্ট নির্দেশ করে যে, বৈশ্বিক দরবারে বাংলাদেশের ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা ও প্রকল্প প্রস্তাবনার গ্রহণযোগ্যতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে।
ইআরডি এবং পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, প্রতিশ্রুত এই বৈদেশিক ঋণ না পাওয়ার পেছনে মূল কারণ হলো দেশের অভ্যন্তরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের পঙ্গুত্ব দশা। আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন মাত্র ৪১ দশমিক ৪১ শতাংশে নেমে এসেছে। আলোচ্য সময়ে উন্নয়ন ব্যয় হয়েছে মাত্র ৮৬,৫১৬ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ হাজার৯২ কোটি টাকা কম।
প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি না থাকায় বিদেশি দাতাগোষ্ঠী প্রতিশ্রুত ঋণের কিস্তি ছাড় না করে আটকে রাখছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যস্ততা এবং মনোযোগের বিভাজন প্রকল্পগুলোকে পুরোপুরি স্থবির করে দিয়েছে, যা বিদেশি ঋণ সুবিধার যথাযথ ব্যবহারকে চরমভাবে ব্যাহত করেছে।
ঋণ প্রাপ্তি ও ডলারের জোগান আশঙ্কাজনকভাবে কমলেও অতীতের নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের বোঝা সরকারের জন্য এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইআরডির তথ্যমতে, বছর ব্যবধানে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ বেড়ে গেছে। চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে সরকার ঋণ পরিশোধ বাবদ একাই ৩৮০ কোটি ডলার পরিশোধ করেছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩৫০ কোটি ডলার। অর্থাৎ ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে ৩০ কোটি ডলার। এই ৩৮০ কোটি ডলারের মধ্যে মূল ঋণ বাবদ ২৪৬ কোটি ডলার এবং কেবল সুদ বাবদ আন্তর্জাতিক বাজারে চলে গেছে ১৩৩ কোটি ডলার।
১০ মাসে খাতভিত্তিক ঋণ ছাড়ে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ৮৩ কোটি ডলার ছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক। এরপর রাশিয়া ৮২ কোটি, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ৭১ কোটি, চীন ৫৩ কোটি, জাপান ৪২ কোটি এবং ভারত ২৫ কোটি ডলার ছাড় করেছে। দাতা সংস্থাগুলোর এই তহবিল প্রস্তুত থাকলেও প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ঐতিহাসিক ব্যর্থতার কারণে এই ঋণের সুফল দেশের নাগরিক বা উৎপাদনশীল পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট ও প্রতিশ্রুত ঋণ না পাওয়ার বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “আমাদের ঋণের স্থিতি বাড়ছে, সেই সঙ্গে ডলারের বিপরীতে সুদ ও আসল পরিশোধের বাধ্যবাধকতাও বাড়ছে। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এই ঋণ পরিশোধের চাপ একধাক্কায় ৫-৬ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকবে। এই সংকটের মধ্যে আমরা যদি অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বাড়াতে না পারি এবং প্রতিশ্রুত বৈদেশিক মুদ্রার জোগান সময়মতো আনতে না পারি, তবে ঋণ পরিশোধের চরম চাপে পুরো অর্থনীতিতে বড় ধরনের দুর্দশা নেমে আসবে। তাই পাইপলাইনের ঋণ দ্রুত ছাড় করতে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে হবে এবং ঋণের টাকা উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করে দ্রুত রিটার্ন নিশ্চিত করতে হবে।”













